মোঃ তাজুদুর রহমান,মৌলভীবাজার।।  এবার চাঁদাবাজি মামলায় ফেঁসে গেলেন কর্মধা ইউপি চেয়ারম্যান এম এ রহমান আতিক। ইতোপূর্বে তিনি কুলাউড়ার জয়চন্ডী ইউনিয়নের মিটিপুরের কাজল হত্যা মামলায় এজহার নামীয় আসামী থাকলেও সরকার দলের প্রভাব কাটিয়ে চার্জশিট থেকে বাদ পড়ে যায় তার নাম । কিন্তু এবার একটি চাঁদাবাজির মামলায় পিবিআই এর তদন্তে আর রক্ষা পেলেন না তিনি।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম এ রহমান আতিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
 এরআগেও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দফতরে রাস্তা নির্মাণে অনিয়ম, সোলার প্রতিস্থাপনে দুর্নীতি, প্রকল্পে শ্রমিকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ হয়েছিলো।
স্থানীয়দের দাবি, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় ২০১৬ সালে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান হঠাৎ দামী গাড়ি, বাড়ির মালিক হয়েছেন দুর্নীতি করে। ক্ষমতার দাপট খাঁটিয়ে এসব দুর্নীতি তিনি হালাল করছেন হরহামেশাই। তবে ইউপি চেয়ারম্যান আতিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পিবিআই আমার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যার কোন ভিত্তি নেই।’
পিবিআইর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জানা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের পুটিছড়া পানপুঞ্জির বাসিন্দা হামরেজ বারে (৪০) নামক জনৈক খাসিয়ার কাছে পান চাষ ও বিক্রি করতে হলে চেয়ারম্যান এমএ রহমান আতিক ৩ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এরপর ১০ নভেম্বর ওই খাসিয়া ৮০ হাজার এবং ২৪ নভেম্বর আরও ২ লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা প্রদান করেন। ৩ লাখ টাকা চাঁদা প্রদানের পরও নিয়মিত চাঁদা দেয়ার হুমকি দেন চেয়ারম্যান। চাঁদা না দিলে খুন করারও হুমকি দেন। চাঁদা প্রদানের আনুমানিক একমাস পর ১৯ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান আতিক, ইউপি সদস্য হোসেন আলী  চৌকিদার হোসেনসহ তাঁদের সহযোগি লোকবল নিয়ে পুটিছড়া পুঞ্জিতে গিয়ে ফের চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু হামরেজ বারে খাসিয়া চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চেয়ারম্যানের নির্দেশে তাঁর সহযোগিরা পানজুম কেটে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেন।
এঘটনার পর হামরেজ বারে মৌলভীবাজার আদালতে একটি পিটিশন মামলা ( নং ৫৭/২০১৯ (কুলাউড়া) ধারা ১৪৩/৪৪৭/৩৪২/৩৮৫/৩৮৬/৩৭৯/৪২৭/৫০৬ (২)/৩৪) দায়ের করেন। মামলা দায়ের পর আদালত বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আদালত পিবিআইকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে পিবিআই উপ-পুলিশ পরিদর্শক (নি:) মো. সাইফুর রহমান সফি গত ১৫ জুলাই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনে (৩৪২/৩৪ ধারা ব্যতিত) ঘটনা প্রমাণিত হয়।
এছাড়াও কর্মধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে ১ম ও ২য় ধাপে শ্রমিকদের টাকা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মুসলিম উদ্দিন নামক প্রকল্পের শ্রমিক ২০১৭ সালের ১২ জুলাই কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট সোলার দেয়ার নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন ইউনিয়নের বাড়ুয়াকান্দি গ্রামের লোকমান আহমদ। একই অভিযোগ কর্মধা গ্রামের ছাতির আলীর স্ত্রী মিলজান বেগমের।
সম্প্রতি ইউনিয়নের বুধপাশা রাঙ্গার দোকান-তাজকারপার মনসুরপুর দুদুর বাড়ীর রাস্তা, বাড়িয়াকান্দি ব্রিক ফিল্ড বাড়িয়াকান্দি হাছনের বাড়ির রাস্তা, মহিষমারা আরব আলীর বাড়ী-পূর্ব কর্মধা মনাই মহাজনের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা ও কাঠাঁলতলী বাজারের মাঠি ভরাটের কাজে ব্যাপক অনিয়ম করেন। স্থানীয়রা বলেন, এসব প্রকল্পে ১০ শতাংশ কাজ করেই তিনি প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বারদের প্রকল্পের দায়িত্ব না দিয়ে নিজ পছন্দের মেম্বারদের প্রকল্প চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন।
এর আগে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে দরিদ্র অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিতরণ করার জন্য একটি গভীর নলকূপ ও একটি রিং টিউবওয়েল কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদকে বরাদ্ধ দেয়া হয়। সেই নলকূপটি তাঁর বড় ভাইয়ের নামে বরাদ্ধ দেখিয়ে নিজ বাড়িতে স্থাপন করেন। ওইসময় তিনি নানা মহলে সমালোচনার পাত্রে পরিনত হন।
স্থানীয় লোকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগে ছিলেন ঋণগ্রস্ত। পাওয়ানাদারদের ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতেন না। কিন্তু চেয়ারমান নির্বাচিত হওয়ার পর পাল্টে যায় জীবনচিত্র। অজানা উৎস থেকে অর্জিত টাকায় কিনেছেন দামি গাড়ী, গড়েছেন বিলাসবহুল বাড়িসহ সম্পদের পাহাড়। যা দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলেই সত্য তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে কর্মধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমএ রহমান আতিক জানান, আমার সুনাম নষ্ট করতে, চেয়ারম্যানকে ঘায়েল করতে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে । একজন খাসিয়া আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে যা এখনো চলমান। টাকার বিনিময়ে পিবিআইকে ম্যানেজ করে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে।