বিশ্বনাথে ফরিদের লাশ দেশে আনতে সরকারের কাছে পরিবারের আবেদন

মো. আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ থেকে::  ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পথে নিখোঁজ সিলেটের বিশ্বনাথের ফরিদ উদ্দিন আহমদ (৩৫) এর লাশ স্লোভাকিয়ার একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বিশ্বনাথ উপজেলার কারিকোনা গ্রামের সমশাদ আলীর ছেলে ও ইস্টান ব্যাংক বিশ্বনাথ শাখার সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। গত ৯ সেপ্টেম্বর স্লোভাকিয়ার স্টারিনা জঙ্গল (দূর্গম পাহাড়ি এলাকা) থেকে ফরিদের মরেদেহ উদ্ধার করে সেদেশের পুলিশ। তিনি গত ২ সেপ্টেম্বর দালাল ও ৫ সঙ্গীর সাথে ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পথিমধ্যে স্লোভাকিয়ার জঙ্গলে নিখোঁজ হন।
এদিকে, ফরিদ উদ্দিন আহমদের লাশ দেশে ফিরে আনতে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন তাঁর পরিবার। রবিবার রাতে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি বিশ্বনাথের কৃতি সন্তান শফিকুর রহমান চৌধুরীর মাধ্যমে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ফরিদের পরিবার একটি আবেদনপত্র দেন। গতকাল সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.এ.কে আবদুল মোমেন’র কার্যালয়ে সেই আবেদনপত্রটি শফিকুর রহমান চৌধুরী নিজ দায়িত্বে পৌছে দেন। এসময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফরিদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস প্রদান করেছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন শফিকুর রহমান চৌধুরী।
ফরিদের পরিবার সুত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে রাশিয়া যান ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। খেলা শেষ হওয়ার মাস খানেক পর তিনি রাশিয়া থেকে ইউক্রেন যান এবং সেখানে দীর্ঘ কয়েক মাস অবস্থান করেন। সম্প্রতি ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার জন্য রাসিয়ায় অবস্থানরত দাদা নামে পরিচিত দালাল লিটন বড়–য়া’র সাথে চুক্তি করেন ফরিদ। দালাল লিটন বড়–য়া’র বাড়ি চট্রগ্রাম জেলায়। সেই চুক্তি অনুযায়ী দালাল লিটন বড়–য়ার এজেন্ট বাংলাদেশে থাকা সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কামাল নামের এক দালালের কাছে ৭ লাখ টাকা জমা রাখেন ফরিদের পরিবার। চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল মাত্র ২ঘন্টা পায়ে হেটে এবং বাকীটা রাস্তা বৈধভাবে গাড়িতে করে ফরিদকে ফ্রান্স পৌঁছানোর পর জমাকৃত ৭ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হবে দালালের কাছে। চুক্তি সম্পাদনের পর ইউক্রেনস্থ দালালের শিবিরে গিয়ে প্রায় ১ মাস সেখানে অবস্থান করেন ফরিদ। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট পরিবারের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন ফরিদ।
এসময় তিনি জানান-পরদিন (২৮ আগস্ট) ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে সঙ্গিদের সাথে যাত্রা করবেন ফরিদ। এই কথা বলার পর থেকে পরিবারের সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি ফরিদের। এরপর সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) ফরিদের ফ্রান্স যাত্রাপথের এক সঙ্গী ফোন করে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তার (ফরিদ) ভাই কাওছার আলীকে ফোন করে জানান-গত বুধবার (২৮ আগস্ট) একজন দালালের সঙ্গে ফরিদ উদ্দিন’সহ তারা ৬ জন ইউক্রেন থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। পায়ে হেঁটে ফ্রান্স পৌঁছতে তাদের ৫ দিন সময় লাগে। কিন্ত তাদের সাথে খাবার ছিল মাত্র দু’দিনের। তাই সাথে থাকা খাবার শেষ হয়ে গেলে তাদেরকে শুকরের মাংস খেতে দেয় দালাল। কিন্ত এই খাবার খেতে অপারগতা জানান ফরিদ। তাই তিনি সাথে থাকা খেজুর খেয়ে আরোও একদিন কাটান। দুই দিন পায়ে হেঁটে তারা পৌঁছেন স্লোভাকিয়ার একটি জঙ্গলে। সেখানে পৌঁছার পর সাথে থাকা খেজুরও শেষ হয়ে গেলে শুকরের মাংস খেতে বাধ্য হন ফরিদ। এই খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ফরিদ। নাকে ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে এবং বমি আর ডায়রিয়া হতে থাকলে একেবারেই দূর্বল হয়ে যান তিনি। ওই জঙ্গলে সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে একটি বিকট শব্দ পেয়ে সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। এসময় ঘুম থেকে উঠে ফরিদকে তাদের (সঙ্গিদের) সাথে দেখতে না পেরে রাঁতের অন্ধকারেই খুঁজতে শুরু করেন তারা। কিন্ত কোথাও ফরিদকে খুঁজে না পেয়ে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েই তাকে ছাড়াই ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে দালাল ও ফরিদের সঙ্গিয় অন্য ৫ জন এবং ২ সেপ্টেম্বর তারা ফ্রান্স পৌঁছেন। তাদের মধ্যে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার নাজির, হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার সোহাগ এবং দিলদার ও বুরহান নামের আরো ২জন ছিলেন।
ফরিদ উদ্দিন আহমদের ভাই গিয়াস উদ্দিন বলেন, ভাইয়ের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরীর মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন করি। ভাইয়ের লাশ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আমাদের পরিবার।