ঘর, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানিবিহীন জগন্নাথপুরের ১০ মুচি পরিবার!

জগন্নাথপুর প্রতিনিধি।।   ‘পরের জায়গা পরের জমিন, ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো সেই ঘরের মালিক নই…’ এটা একটা বিখ্যাত গান হলেই গানের লাইনগুলোই যেন জগন্নাথপুরের ১০ মুচি পরিবারের কথা। যেই তাদের জীবনকেই তুলে ধরা হয়েছে গানের তালে, সুরের মূর্ছনায়!

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পৌর এলাকায় চার দিকের ঘরদোর বিদ্যুতের আলোয় ঝকঝক করছে। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগেও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি একটি শত বছরের পুরনো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (মুচি সম্পপ্রদায়) ঘরে। নেই বিশুদ্ধ পানি পানের জন্য একটা নলকূপও। আর নিজের ঘর তো তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। ঘর, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির জন্য জগন্নাথপুর পৌর এলাকার ১০ মুচি পরিবার এখনো শুধু স্বপ্নই দেখে, কিন্তু বাস্তবতা যে পড়ে আছে গহীন অন্ধকারে।

শুধু তাই নয়, সমাজের নানা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। এ কারণে তাদের সন্তানরা পড়া-লেখার বাইরে। যা বর্তমান সরকারের ডিজিটাল যুগে এসে বেমানান।

৮ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর সভা নিয়ে গঠিত জগন্নাথপুর উপজেলা। প্রতিটি গ্রাম বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হলেও বাদ রয়েছে কেবল মুচি বাড়ি। জগন্নাথপুর পৌর এলাকার ৯ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম ভবানীপুর গ্রামের পুরানো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (মুচি সম্প্রদায়) কাচা ও কালী, রবি দাসের বাড়ি উপজেলার সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত। পৌর এলাকায় আলাদাভাবে মাত্র ১০টি মুচি পরিবার রয়েছে, কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো থাকার জায়গা নেই।

জগন্নাথপুর পৌর এলাকার পশ্চিম ভবানিপুর ৯ নং ওয়ার্ডে ৬ পরিবার ও ৫ নং ওয়ার্ডের সিক্কা এলাকায় ৪ মুচি পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের অন্তত অর্ধশতাধীকেরও বেশি লোকজন কোন রকম পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন। এর মধ্যে তারা সমাজের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মুচি সম্প্রদায়ের লোকজন।

মুচি সম্প্রদায়ের একাধিক লোকজন জানান, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত তারা বিদ্যুতের আলোর মুখ দেখেন নি। ফলে তারা ডিজিটাল বাংলাদেশের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের সময় নানা প্রতিশ্রতি দিয়ে ভোট আদায় করেন বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী প্রার্থীরা। কিন্তুু ভোটের পর তাদের চেহারা আর একবারও দেখা যায় না। এমনকি নির্বাচিত হলেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিবেন বলেও আশ্বাস দেন অনেকেই। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। তবুও বিদ্যুতের আলোর দেখা নেই। অন্ধকারেই তাদের বসবাস। কুপি বাতিই তাদের আলোর ভরসা। ৬টি পরিবারের নেই বিশুদ্ধ পানির খাবার ব্যবস্থা (টিউবওয়েল)।

এছাড়াও মুচিপাড়ার স্যানিটেশন ব্যবস্থাও রয়েছে খুবই নাজুক। অথচ জগন্নাথপুর উপজেলার হতদরিদ্র মানুষের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ মান্নান এমপি একশত কোটি টাকা ব্যয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন স্থাপন করেন। কিন্তু তা থেকেও বঞ্চিত মুচিপাড়া।

শুধু তাই নয়, বিদ্যুতবিহীন মুচিপাড়ার শিশুরা বেশীর ভাগই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বিভিন্ন কাজ করছে তারা। ফলে তাদের স্কুলে যাওয়ার সময় হয় না। আবার অনেকেই পিতার কাজে সহযোগীতা করছে। আর এ কারণে স্কুলে বা পড়া লেখার সময় তাদের নেই। মুচিদের জন্ম সূত্র পেশায় বিভিন্ন পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয়, জুতা সেলাই করাই তাদের প্রধান কাজ। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধা রাত পর্যন্ত তারা এ কাজ করে।

পশ্চিম ভবানিপুর ৯ নং ওয়ার্ডের ৬ মুচি পরিবারের মধ্যে চার শিশু লেখাপড়া করছে। এর মাঝে দুইজন বৃষ্টি রবি দাস ও দিপ্তী রবি দাস পৌর এলাকার হলিচাইল্ড কিন্ডারগার্টেন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।

সরেজমিনে পশ্চিম ভবানীপুর মুচি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চার ৬টি মুচি পরিবার এই বাড়ির লোকজন মানবেতর জীবন যাপন করছে। মুচি বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। আর যে ঘরে তাদের বসবাস সেটাও অন্যের। বাড়ির বাসিন্দা কাচা রবি দাস বলেন- ‘যাদের বাড়িঘর নাই সরকার থেকে তাদেরকে বাড়ি করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা মুচি বলে শুধু ভোটের সময় আমাদের অধিকার।’

এ নিয়ে এলাকার সচেতন সমাজের লোকজনও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেছেন। তারা বলেছেন, শত বছরের পুরাতন এই মুচি বাড়িতে বিদ্যুৎ ও নলকূপ ও স্যানিটেশন ব্যাবস্থা না করে আশপাশের গ্রামগুলোতে এগুলো দেওয়া হয়েছে। তারা এই অবহেলিত জনগোষ্ঠির নাগরিক অধিকার পূরণের দাবি জানিয়েছেন।

মুচি বাড়ির বাসিন্দা কালী চরন রবি দাস জানায়, ‘আমাদের বাড়িতে কারেন্ট (বিদ্যুৎ)ও নলকূপ নাই, আমরা অনেক কষ্ট করে বসবাস করছি। পাশের গ্রামগুলোতে কারেন্ট থাকলেও আমাদের বাড়িতে কারেন্ট নাই। কেউ আমরার খোঁজ খবর নিতে আইন না। যখন ভোট আয় তখন এলাকার নেতারা আইন ভোটের লাগি। পরে আর খোঁজ খবর রাখইন না।’

বাড়ির বাসিন্দা লাকি রানী রবি দাস বলেন, ‘আমরা খালের পানি খেয়ে বসবাস করছি। টিউবওয়েল গাড়ার (বসানো) সামর্থ্য নাই। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। আত্মীয় স্বজনরা আসলে তাদের কাছে লজ্জিত হই। তাদেরকে ভালো পানিও খাওয়াতে পারি না। খাওয়াতে হয় খালের পানি।’ ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি রবিদাস জানান- ‘আমরা লেখাপড়া করতে চাই, দেশের নাগরিক হিসেবে সকল সুযোগ সুবিধা চাই।’

একই দাবি দীপ্তি রানী রবি দাসের। তিনি বলেন- ‘সরকার গরিবদের বাড়িঘর, নলকূপ, বিদ্যুৎ দিচ্ছে, কিন্তু আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। আমরা কি দেশের নাগরিক না।’

এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজ আলম মাসুম বলেন, তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ আছে, ‘সেটা সমাজসেবা অফিসার সব জানেন। আমার জানা নেই।’