ওই সময় ভিভিআইপি কক্ষে অবস্থানের কথা ছিল প্রধান বিচারপতির

ওয়েছ খছরুঃওই সময় সার্কিট হাউজেই থাকার কথা ছিল প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার। কিন্তু হেলিকপ্টারের ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ার কারণে তিনি সার্কিট হাউজে যাননি। তবে, এরই মধ্যে তিনি সিলেটে এসে পৌঁছেছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে তিনি সার্কিট হাউজে না গিয়ে অনুষ্ঠানস্থলেই চলে যান।’ গতকাল মানবজমিন-এর কাছে এমন তথ্য জানিয়েছেন সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম সমিউল আলম। টাইমিংয়ের ব্যবধান ছিল ১৫ থেকে ২০ মিনিট। যদি প্রধান বিচারপতি ওই সময় সার্কিট হাউজে অবস্থান করতেন তাহলে অঘটনের সম্ভাবনা ছিল। আইনজীবী সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, ‘প্রধান বিচারপতির সফর সিডিউলেই ছিল তিনি বিমানবন্দর থেকে সার্কিট হাউজে যাবেন। বিশ্রামের পর তিনি যোগ দেবেন অনুষ্ঠানে।’ এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধও সিলেটের আইনজীবীরা। তারা দাবি করেন, এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে অন্য কিছু থাকতে পারে। নতুবা প্রধান বিচারপতির যখন সিলেট সার্কিট হাউজে অবস্থানের কথা তখনই বা কেনো ঘটবে অগ্নিকাণ্ড। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদউল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেছেন, সিলেট সার্কিট হাউজের প্রধান বিচারপতির কক্ষে যদি মনে করা হয় এটি একটি দুর্ঘটনা তাহলেও সেটির জন্য দায়ী সিলেট জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা। কারণ, এ গাফিলতির দায় তারা এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এদিকে, সিলেট সার্কিট হাউজে প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ করা কক্ষে আগুন নিয়ে রহস্য দানা বাঁধছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- এটা কী স্রেফ আগুন না নাশকতা। আর কেবলমাত্র আগুন হলেই বা টাইমিং হলো কীভাবে। যখন প্রধান বিচারপতি সিলেটে এসে পৌঁছেছেন তারপরই বা কেনো আগুন লাগবে ভিভিআইপি কক্ষে। এসব নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন এ ঘটনায় গঠিত দুটি তদন্ত টিমের কর্মকর্তারা। তবে, এই আগুন নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সিলেটে। সুধীমহলেও চলছে আলোচনা। আর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তো গলদঘর্ম অবস্থা। সমপ্রতি সিলেটে পাঠানো সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার শাখার নির্দেশনাপত্রেও এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজারে। এক কালে তিনি সিলেটে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এ কারণে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে নিয়ে গর্ব করেন সিলেটের আইনজীবীরা। গত ৩রা মার্চ সিলেটে আসেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমদ পলক সহ ভিভিআইপিরা। সঙ্গে ছিলেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। সিলেটের আদালতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে তারা সিলেটে আসেন। ভিভিআইপিরা সিলেটে আসার কারণে প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রীর বিশ্রামের জন্য সিলেট সার্কিট হাউজের ২০১ ও ২০২ নম্বর কক্ষ বরাদ্দ রাখা হয়। সকাল ১০টার মধ্যে প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রী হেলিকপ্টার যোগে সিলেটে আসার কথা ছিল। এরপর তারা সিলেট সার্কিট হাউজের ওই কক্ষগুলোতে বিশ্রামের পর অনুষ্ঠানস্থলে আসার কথা। কিন্তু ওইদিন হেলিকপ্টারটি বিলম্বে পৌঁছায় সিলেটে। প্রায় ৪০ মিনিট বিলম্বের পর হেলিকপ্টার যখন সিলেটে পৌঁছে তখনই সিলেট সার্কিট হাউজের ভিভিআইপি ২০১ ও ২০২ নম্বর কক্ষে আগুন লাগে। এ সময় সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন জাতিসংঘের ইউএনডিপির কর্মকর্তারা। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ৭ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে পার্শ্ববর্তী তালতলা এলাকা থেকে ফায়ার ব্রিগেডের দুটি দল পৌঁছায় সার্কিট হাউজে। তারা পৌঁছে দ্রুতই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু তার আগেই সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায় ভিভিআইপিদের জন্য বরাদ্দকৃত ওই দুটি কক্ষ। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটার পরপরই মুহূর্তে দুটি কক্ষে আগুন ছড়িয়ে যায় বলে ওই দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বেশকিছু মালামাল উদ্ধার করেছেন। সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত সিলেট সার্কিট হাউজ। ঐতিহাসিক কীনব্রিজের গা-ঘেঁষেই অবস্থান সার্কিট হাউজের। এই সার্কিট হাউজের নতুন ভবনটি দৃষ্টিনন্দন করে নির্মাণ করেছিল বিগত সরকার। কিন্তু সার্কিট হাউজের দুর্নাম কম নয়। প্রশাসনের কর্মচারীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বার বার আলোচনায় এসেছে সার্কিট হাউজ। সাবেক জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলামের জমানায় সিলেট সার্কিট হাউজের ভেতর থেকে চলতো ফেনসিডিল ব্যবসা। এমনটি জানিয়েছিলো র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এক গাড়িচালক। এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছিল সিলেটে। এছাড়া, সার্কিট হাউজ সরকারি কর্মচারীদের কাছে আড্ডাস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছিলো। সার্কিট হাউজকে পরিণত করা হয় আবাসিক কক্ষেও। সরকারি কর্মচারীরা ইচ্ছে মতো পুরাতন ভবনের কক্ষগুলো ব্যবহার করেন। ফলে সব সময়ই সরকারি কর্মচারী এমনকি বাইরের মানুষকে যাতায়াতে সরগরম থাকে সার্কিট হাউজ। এছাড়া, সার্কিট হাউজের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। কেবলমাত্র ভিভিআইপিরা এলে ওই সময় সার্কিট হাউজে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নতুবা নিরাপত্তাহীন অবস্থায় থাকে সার্কিট হাউজ। মূল ফটকও থাকে সব সময় খোলা। প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রী যেদিন সিলেটে আসার কথা সেদিনও সার্কিট হাউজের অবস্থা এরকমই ছিল। নতুন ভবনের নিরাপত্তা জোরদার থাকলেও পুরাতন ভবনের দিকে খেয়ালই ছিল না কারও।