এক হিজড়ার আত্মকথা (ভিডিও সহ)

শরিফুল ইসলাম পলাশ: ‘জীবন মানেই তো যন্ত্রণা, বেঁচে থাকতে বোধহয় শেষ হবে না’ নিজের লেখা নয়, তবুও গানটি ভীষণ প্রিয় কাজলের। কারণ এই গানে যেন তারই জীবনের কথা বলা হয়েছে। এক শুক্রবারের সন্ধ্যায় গুণগুণ করে গান দিয়েই শুরু করেন আলোচনা। গতকাল ইউটিউবে ‘দ্য পাথ ক্রিয়েটর’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত কাজল শিকদারের ১৫ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের ভিডিওতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর বঞ্চনাময় জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে। বন্ধু মিডিয়া ফেলো আমার নেয়া সাক্ষাকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হচ্ছে পাঠকদের জন্য।

শুরুতেই আত্মকথন, শুনুন তার মুখেই। ‘আমি কাজল শিকদার, চার-ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। ঢাকাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা-মায়ের খুব আদরের ছিলাম বলেই পড়ালেখাটা শেষ করতে পারিনি’। কাজল বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা করেন। বন্ধু স্যোশাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ‘ভিন্ন ধর্মী ফ্যাশন শো’র সঙ্গে যুক্ত আছেন। আগে একটি বেসরকারি সংস্থার প্রকল্পে কাজ করেছেন, প্রকল্পটি ক’বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর থেকেই হিজড়া পেশাই তার মূল আয়ের পথ। ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে জানালেন, ‘ছোটবেলায় আমার বড় ভাই খুব শাসন করতো। বাইরে বের হতে দিতো না। কারো সঙ্গে মিশতে দিতো না। আমার ভাইয়েরও কোনো দোষ নাই, ভাইয়ার বন্ধুরা হয়তো বলতো তোর ভাইটা এরকম কেন? কালকে দেখলাম হিজড়াদের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে। বিভিন্ন কারণে ভাইয়া চোখে চোখে রাখতো’।

শুধু কাজল নয়, তার মত হিজড়াদের ছেলেবেলায় পরিবার থেকে বেশ চাপেই রাখা হয়। সমাজের মানুষের নানা কটু কথার কারণেই পরিবার চাপের মধ্যে রাখতে বাধ্য হয়। ঘরে ছেড়ে চলে আসার সম্পর্কে কাজল বলেন, ‘পরিবারে থাকার সময় যখন দেখি আমার কারণে আমার বোনের বিয়ে হচ্ছে না, ভাইও ভালো জায়গায় বিয়ে করতে পারছে না- তখন পরিবার অনেক কথা বলে। আর তখনই আমরা ঘর ছেড়ে আমার মত যারা আছে তাদের কাছে চলে আসি। এসে হিজড়াদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করি। সেখানেও আমাদের একজন মা থাকে, আমরা তার কথামত চলি। হিজড়া বোন, চেলা-নাতি চেলাদের নিয়ে আমাদের আলাদা একটি জগৎ’। ভিন্নধর্মী ঐ সাক্ষাৎকারটির দেখবেন ইউটিউব চ্যানেল লিংক-এ।

হিজড়া জীবনে প্রেম? এমন প্রশ্নের জবাবে কাজলের উত্তর, ‘আমাদের জীবনের প্রেম হচ্ছে বসন্তের মত। বসন্তে বাগানে ফুল ফুটলে যেমন কোকিল আসে, আমাদের জীবনে প্রেমটাও তেমনই। প্রেম হয়, তারপরও ভেঙ্গেও যায়। কিছুদিন একা থাকি, কষ্ট পাই। তারপর আবার হয়তো আরেকজন আসে। একটি ছেলে আসলে একটি মেয়ের জন্য, আমি যতই একটি ছেলেকে ভালোবাসি সে একদিন বিয়ে করবেই। একটি মেয়ের কাছে সে যাবেই- এটা মেনে নিয়ে বন্ধু হয়ে থাকলে প্রেমটা টিকে থাকে। কিন্তু এর বেশি কিছু আশা করলে সেটা ভুল’। সাক্ষাৎকারটিতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর শৈশব, ঘর ছেড়ে চলে আসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্পত্তির অধিকার না থাকা, সরকারি চাকুরির নামে প্রহসন সহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। ‘এই জীবন কোনো জীবন নয়, কুকুরেরও দাম আছে কিন্তু আমাদের কোনো দাম নেই’ বলে উল্লেখ করেছেন কাজল। সেইসঙ্গে এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে করণীয় সম্পর্কেও মত দিয়েছেন।

জন্মটাই দোষ’ বলেই মানবিক সাধ, চাহিদা তাদের জন্য নিছকই কষ্ট কল্পনা। কষ্টের নীলে সিক্ত কাজলের স্পষ্ট রায় “এই জীবন, জীবন না”।

অপমান-বৈষম্য-লাঞ্চনার তিক্ততার মধ্যেই যাপিত জীবনে অধিকার পাওয়ার প্রশ্নেও জোড়ালো অভিমত দেন তিনি।

বাংলাদেশের সরকারের ট্রাফিক পুলিশে হিজড়া নিয়োগে নেয়া উদ্যোগের সমালোচনা, শিক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাহাড়সম প্রতিবন্ধতা, পারিবারিক সম্পত্তিতে অধিকারে বৈষম্যসহ নিজেদের দোষত্রুটি সম্মন্ধেও অকপটে বলেন হিজড়া কাজল।

আসলেই আমরা কি মেনে নেবো তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষদের?? (ভিডিও)