|

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানকে নিয়ে অবান্তর বিতর্ক শোভনীয় নয় -সুজাত মনসুর

 

সম্প্রতি দিরাই থানার জগদল ইউনিয়নের রায়বাঙালি গ্রামের প্রয়াত বিলেত প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানকে নিয়ে একটা অবান্তর বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে, যা অশোভন ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অপমান স্বরূপ। আর এই বিতর্কের সুচনা করেছেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা উত্তর দিরাইতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অন্যতম নেতা জনাব আতাউর রহমান। তিনি দিরাই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্যাডে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, মরহুম আব্দুল মান্নান, (সবার নিকট যিনি রায়বাঙালির মনাফ নামে পরিচিত ছিলেন) কমান্ডার দুরে থাক, আদৌ মুক্তিযোদ্ধাই নয়। কিন্তু তাঁর বিলেত প্রবাসী সন্তানরা তাঁকে মিথ্যা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাজিয়ে এবং তাঁর নামে স্মৃতি পরিষদ গঠন করে প্রতারণা করছে এবং ছোট ছেলে জুবের আলম খুরশেদ ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।
এই চিঠিটি পড়ে আমি সত্যিই মর্মাহত ও আশ্চর্য্য হয়েছি, এই ভেবে যে আতাউর ভাইর মত একজন মুক্তিযোদ্ধা কি করে শুধুমা্ত্র সার্টিফিকেট নেই বলে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে অস্বীকার করতে পারেন? কিভাবে বলেন তাঁর ছেলেরা বিশেষ করে জুবের আলম প্রতারণা করছে। আতা্উর ভাইয়ের কথামত যেহেতু সার্টিফিকেট নেই, সুতরাং আব্দুল মান্নান মুক্তিযোদ্ধা নন। আর মুক্তিযোদ্ধা নন, এমন ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করা সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদেরই অপমান। তা তো ঠিকই আছে।
কিন্তু সার্টিফিকেট নেই একজন প্রকৃত মুৃক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান অমুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবেন, শুধুমাত্র আতাউর রহমান সাহেবের একটি বিবৃতিতে এটা কেমন কথা? কেউ কি তার প্রতিবাদ করবে না? আমার তো স্পষ্ট মনে আছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মনাফ ভাই স্টেনগান কাধে আমাদের জগদলের বাড়িতে এসেছিলেন। এছাড়া সমগ্র দিরাইবাসী না জানলেও রায়বাঙালির আশেপাশের গ্রামগুলোর অনেকেই জানতো মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানের কথা। আমরা এও শুনেছিলাম তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। স্বাধীনতার পর তিনি বিলেতে ফিরে আসেন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। বিলেতে চলে আসার কারনে তিনি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তাঁর সন্তানরাও সার্টিফিকেটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি, বা প্রয়োজন বোথ করেনি। চেষ্টা-তদবির করে বিলেতবাসী হয়ে ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে। তাই বাপের নামে সংগঠন করে দেশের গরীব-দুঃখি মানুষকে সাধ্যমত সহায়তা করার চেষ্টা করে।
এখন প্রশ্ন হলো সার্টিফিকেট কিংবা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম নেই বলে আব্দুল মান্নান যে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তা মিথ্যে হয়ে যেতে পারে না। আমি এই লেখাটি লেখার আগে আমার স্মৃতিকে পরখ করে নেবার জন্য ফোন করি রায়বাঙালির আরেক মুক্তিযোদ্ধা ছাতির ভাইকে, যিনি আব্দুল মান্নান সাহেবের সাথে ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে ছিলেন। তিনি বলেছেন, প্রয়াত আব্দুল মান্নান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না বলা, আর তাঁর(ছাতির ভাই) নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা একই কথা। এছাড়া দিরাই হাইস্কুলের শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরীক্ষা করে দেখলাম, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এমন তিনজন মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় নেই। তাঁরা হলেন জগদলের আব্দুল হামিদ, হাতিয়ার তালেব আহমেদ ও কুলঞ্জের হারুন রশীদ চৌধুরী। তাহলে তারা কি মুক্তিযোদ্ধা নন? এ কথা সবাই জানে বাংলাদেশে এখনো হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে যাদের সার্টিফিকে নেই, কিংবা তারা তা সংগ্রহ করতে প্রয়োজনবোধ করেননি। তাই বলে তারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে খারিজ হয়ে যেতে পারেন না। আবার সার্টিফিকেটধারী এমনো মুক্তিযোদ্ধা আছে তারা আদৗ মুক্তিযোদ্ধা নয়। এমনকি অনেক রাজাকারও ভুয়া সনদ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসে আছে আর দিব্যি সরকারি সুযোগ-সুবিধাভোগ করছে। সাম্প্রতিকালে এমন পাঁচজন সচিব চিহ্নিত হয়েছে, যাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ রয়েছে। সুতরাং সার্টিফিকেট নেই বলে আতাউর রহমান, আব্দুল মান্নান মুক্তিযোদ্ধা নয় বলে ঘোষণা দিতে পারেন না, উচিৎও নয়।
আর প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান সাহেবের ছেলেদের প্রতারণার কথা তিনি বলেছেন। তারা কি তাদের বাবার নামে সংগঠন করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রাহাজানি কিংবা সরকার থেকে কোন সুযোগ-সুবিধা আদায় করছে? নাকি কারো পাকা ধানে মই দিয়েছে? আমার ধারণা আতাউর ভাই কেন, কেউই প্রমাণ দিতে পারবেন না। বরং বলা যায়, তারা বিশেষ করে জুবের আলম তার বাবার নামে সংগঠন করে গরীব-দুঃখি মানুষকে সাধ্যমত সহায়তা করে থাকে। এছাড়া খেলাধুলা, শিক্ষা যে কোন ক্ষেত্রেই সে সহায়তার চেষ্টা করে। এতে তো মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের খুশি ও সম্মানিতবোধ করার কথা। অপমান বোধ করবে কেন? আমার ধারণা আতাউর ভাইকে কেউ ভুল বুঝিয়েছে। আশাকরি তিনি তার ভুল বুঝতে পারবেন এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আরেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাথে বৈরিতা নয়, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

সংবাদটি 349 বার পঠিত
advertise