|

নেইমার ছন্দে কোয়ার্টারে ব্রাজিল

ম্যাচ শুরুর বহু আগেই সাম্বার ঢেউ উঠে সামারা এরিনার গ্যালারিতে। ঢেউ গিয়ে যেন আছড়ে পড়ছিলো পাশের ভলগা নদীতে। আর এই সামারা এরিনায় ঢেউ উঠিয়েছেন নেইমার। মেসি, রোনালদো যা করে দেখাতে পারেননি, এদিন সামারা স্টেডিয়ামে ৪৫ হাজার দর্শকের সামনে সেটাই করে দেখিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান সুপার স্টার। নিজে গোল করেছেন, করিয়েছেন রবার্টো ফিরমিনোকে দিয়ে। নেইমারের জ্বলে উঠার দিনে প্রতিবেশী মেক্সিকোকে ২-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলো পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।

কাজানে মেসির বিদায়ের পর নিজনি নভোগরদে বিদায় নিয়েছিলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। গতকাল স্বাগতিক রাশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় ঘণ্টা বাজে আরেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের। আগেই গ্রুপ-পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিলো বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। অঘটনের এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে নিয়েও ভয়ে ছিলো লাখো কোটি সমর্থকের। সামারায় ব্রাজেলিয়ান দর্শকদের মাঝেও মেক্সিকো আতঙ্ক কাজ করছে। স্টেডিয়ামে প্রবেশের মুখেও মেক্সিকানদের যতোটা উৎফুল্ল মনে হয়েছে, ততোটা শান্ত ছিলো ব্রাজেলিয়ানরা। তবে ম্যাচ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেতে থাকে ব্রাজিলের সমর্থকদের দৃশ্যপট। নেচে গেয়ে তারা মাতিয়ে তুলে সামারার গ্যালারি। যা চলতে থাকে রাতভর।

গ্রুপ-পর্বে প্রথম ম্যাচ ড্র করলেও পরবর্তী দুই ম্যাচ জিতে গ্রুপসেরা হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রাখে ব্রাজিল। অন্যদিকে জার্মানিকে হারিয়ে শেষ ম্যাচে সুইডেনের কাছে বড় ব্যবধানে হারায় রানার্সআপ হয়ে ব্রাজিলের সামনে পড়ে মেক্সিকো। এদিন ব্রাজিলের একাদশে মাত্র একটি পরিবর্তন এনেছেন কোচ তিতে। ইনজুরির কারণে এই ম্যাচে ছিলেন না লেফট ব্যাক মার্সেলো। তার পরিবর্তে সুযোগ পান ফিলিপ লুইস। অন্যদিকে, এই ম্যাচে আক্রমণভাগ থেকে রক্ষণভাগের দিকে বেশি জোর দিয়েছে মেক্সিকো। অভিজ্ঞ রাফায়েল মারকুয়েজ, আয়ালাকে নিয়ে শক্তিশালী রক্ষণভাগ রয়েছে মেক্সিকোর। তবে এই ম্যাচে লাইয়ুনের পরিবর্তে আক্রমণভাগে চিচারিতোর সঙ্গী হয়েছেন গালার্দো।

মেক্সিকোর শক্তিশালী রক্ষণের সামনে শুরুতে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলো না ব্রাজিল। শুরুর মিনিট বিশেকের মধ্যে ব্রাজিলের বেশিরভাগ আক্রমণগুলো অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ছিলো। এরপরই নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে সেলেসাওরা। ম্যাচের ২৫ মিনিটে দুই মেক্সিকান ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে একাই বক্সে ঢুকে পড়েন নেইমার। দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তার নেয়া শট গোলরক্ষক ওচোয়া প্রতিহত করেন। পরের পাঁচ মিনিটে নেইমার ও গ্রাবিয়েল হেসুস বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও মেক্সিকোর জমাটরক্ষণের কারণে গোলে পরিণত করতে পারেনি। ম্যাচের ৩৪ মিনিটে সহজ সুযোগটি এসেছিলো ব্রাজিলের। কৌতিনহোর শট গোলরক্ষক গুইলের্মো ওচোয়া ফিরিয়ে দিলে বল এসে পড়ে পাওলিনহোর সামনে। তবে পাওলিনহোর নেয়া শট ছোটবক্সের মধ্য থেকে ক্লিয়ার করেন কার্লোস স্যালসেদো। কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর মেক্সিকো মাঝে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিলো ব্রাজিলের রক্ষণে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে কৌতিনহোর নেয়া জোরালো শট রুখে দিয়ে মেক্সিকানদের এ যাত্রায় রক্ষা করেন ওচোয়া। তবে নেইমারকে আর থামানো যায়নি।

ম্যাচের ৪৯তম মিনিটে একাই দুই মেক্সিকান ফুটবলারকে কাটিয়ে উইলিয়ানকে বল দিয়ে বক্সে ঢোকেন নেইমার। ডানদিক দিয়ে উইলিয়ানের ক্রস হেসুসকে পা লাগাতে ব্যর্থ হলে তাতে টোকা দিয়ে ব্রাজিলকে ১-০ গোলের লিড এনে দেন এই পিএসজি তারকা (১-০)। ম্যাচের ৬২ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে দলকে বাঁচান ব্রাজেলিয়ান গোলরক্ষক অ্যালিস। হ্যাভিয়ের হার্নান্দেজের নেয়া শট কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করে। এক গোলে পিছিয়ে আক্রমণে ধার বাড়াতে পরপর দুটি পরিবর্তন করে মেক্সিকো। এতে লাভ হচ্ছিলো না। উল্টো দ্বিতীয়ার্ধে আরো আগ্রাসী ব্রাজিল সুযোগ তৈরি করে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে। উইলিয়ানের দূরপাল্লার শট অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন মেক্সিকান গোলরক্ষক। ম্যাচের ৮৯ মিনিটে নিজে গোল না করে রবার্টো ফিরমিনোকে দিয়ে গোল করেন নেইমার। ডানদিক দিয়ে তিন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সে বল পাঠান এই পিএসজি তারকা। তার বাড়ানো বলেই আলতো টোকা দিয়ে জালে জড়ান পওলিনহোর বদলে নেয়া এই মিডফিল্ডার।

ব্রাজিলের সঙ্গে অতীত রেকর্ড ভালো নয় মেক্সিকোর। বিশ্বকাপে তো নয়ই। বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনই ব্রাজিলের জালে বল ঢোকাতে পারেনি মেক্সিকো। মেক্সিকো সর্বশেষ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। আর ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বিদায় নিয়েছিলো কেবল ১৯৯০ সালে। সময় যতো ফুরাচ্ছিলো এসমস্ত পরিসংখ্যানই হয়তো ঘুরে ফিরে আসছিলো মেক্সিকানদের মাথায়। তাইতো মেক্সিকান দর্শকদের আওয়াজও আস্তে আস্তে কমে আসছিলো। শুরু হয়েছিলো ব্রাজেলিয়ানদের উল্লাস। এই উল্লাস এখান থেকে যাবে কাজানে। যেখানে বেলজিয়াম-জাপান ম্যাচের জয়ীদের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়নরা।

ব্রাজিল একাদশ: অ্যালিসন, থিয়াগো সিলভা (অধিনায়ক), মিরান্দা, ফ্যাগনার, ফিলিপে লুইস, কৌতিনহো, ক্যাসেমিরো, পওলিনহো, উইলিয়ান, গ্যাব্রিয়েল হেসুস এবং নেইমার।

মেক্সিকো একাদশ: গুইলের্মো ওচোয়া (গোলরক্ষক), আয়ালা, কার্লোস স্যালসেদো, রাফা মারকুয়েজ (অধিনায়ক), এডসন আলভারেজ, কার্লোস ভেলা, আন্দ্রেস গুয়ার্দাদো, হেক্টর হেরেরা, হ্যাভিয়ের হার্নান্দেজ, হার্ভিং লোজানো, গালার্দো।

সংবাদটি 87 বার পঠিত
advertise