|

সিলেটে সাংবাদিকতার আড়ালে ওরা কারা!

সৈয়দ বাপ্পী,অতিথি প্রতিবেদক।।  

একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত আছেন। নিজের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালও আছে। তিনি ওই অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক। তার নেই কোনো অফিস, নেই কোনো স্টাফ। সময় সুযোগে অন্য নিউজ পোর্টালের সংবাদ কপি করে নিজের পোর্টালে প্রকাশ করেন। কেউ কথা না শুনলে তাকে হুমকিও দেন। তিনি একজন সম্পাদক!

জাতীয় দৈনিকে সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। হঠাৎ সপ্তাহে দু‘একদিন পত্রিকাটি কুরিয়ার মাধ্যমে সিলেটে আসে। এসব পত্রিকা আবার হকার বা এজেন্টেদের কাছে পাওয়াও যায় না। হাতেগুনা যে ক‘টা পত্রিকা আসে, তা আবার নম্বরবিহীন অনটেস্ট মোটরসাইকেলে করে নিজেই বিলি করেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তিনিও একজন সাংবাদিক!

একসময়ে সিলেটের একটি আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকায় ফটো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। অফিসও ছিলো বিশাল। পত্রিকাটি প্রিন্ট সংস্করণ প্রকাশ হত প্রতিদিন। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এই পত্রিকাটি প্রকাশ হয়না। আইডি কার্ডটিও অনেক পুরাতন। কিন্তু এই পত্রিকার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অনলাইন ভার্সনে মাঝে মাঝে সংবাদ প্রকাশ হয়। সিলেটেরে অনেক অনুষ্ঠানে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সাথে ছবিও তুলেছেন তিনি। এসকল ছবি মোবাইলে দেখিয়ে তিনি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজেকে অর্থমন্ত্রীর কাছের মানুষ হিসেবে পরিচয়ও দেন। তিনি একজন ফটো সাংবাদিক!

সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা। অনেকে আবার ভয়ও পায়। তাছাড়া সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক, জাতির দর্পণ। তাই সাংবাদিকদের সবাই সম্মানও করে।

আর এই সম্মান ও ভয়কে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিক নামধারী কিছু কথিত সম্পাদক ও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত এই সিলেট মহানগরে। মাইক্রোবাস চালক থেকে এখন ফটো সাংবাদিক, একসময়ের ছিনতাইকারী এখন অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক, একসময়ের ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ী এখন অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক। এদের মুল উদ্দেশ্য প্রশাসনের চোখে ধূলি দিয়ে নিজেদের ফায়দা নেয়া।

চলতি মাসের ১৫ সেপ্টেম্বর শনিবার রাতে দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকা অফিসে এসে কিছু সিএনজি অটোরিকশা মালিক এবং চালক অভিযোগ করে বলেন, সিলেটের কিছু কথিত সাংবাদিক পুলিশের সাথে আঁতাত করে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও পত্রিকার নামে সিএনজি অটোরিকশার পিছনে অথবা গ্লাসে ‘লগো’ লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পত্রিকা বিলি করার নামে ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে চালাচ্ছেন। এ সকল সিএনজি অটোরিকশা পুলিশের চোখের সামন দিয়ে নগরীতে ভাড়ায় চলছে। এমনকি দৈনিক সিলেটের মানচিত্র ও দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকার নাম ব্যবহার করেও নগরীতে কিছু সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করার অভিযোগ করেছেন তারা। তারা জানান, সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়সহ সিলেট জেলার সকল উপজেলায় প্রায় এক হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা চলছে।

এসকল এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে নামে দৈনিক সবুজ সিলেট। গত ১০ দিন সিলেটের বিভিন্ন সড়কে সরেজমিনে অবস্থান করে সবুজ সিলেট টিম। অনুসন্ধানে পায় এই সব কথিত সাংবাদিকের অপকর্মের তথ্য।

কথিত এই সব সাংবাদিক দৈনিক সিলেট সুরমা, জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশের খবর, ভোরের পাতা, দৈনিক রুদ্র বাংলা, বাংলাদেশ সমাচার, আলোকিত সিলেট টুয়েন্টিফোর ডট কম, বাংলার মাটি ডট কম, যুগপৎ ডট কম-এর নামে প্রায় ৫০০টি গাড়ি সিলেট মহানগরে চলাচল করছে। রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে চলতে প্রতি গাড়ি বাবত মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং অনটেস্ট সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে চলতে নামধারী সাংবাদিকদের ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। এসকল সিএনজি অটোরিকশা নগরীর দরগাহ গেইট স্ট্যান্ড, আম্বরখানা স্ট্যান্ড, শাহপরান মাজার স্ট্যান্ড, বন্দরবাজার স্ট্যান্ড, শিবগঞ্জ সাদিপুর স্ট্যান্ড থেকে জাফলং রোডে চলাচল করে।

কথিত সাংবাদিকরা এসকল সিএনজি অটোরিকশা নিজের বলে অন্যের মালিকানা গাড়ি নগরীতে দাপটের সাথে চালাচ্ছেন।

প্রশাসনের দাবি, এবিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা যেখানেই দেখেন আটক করেন। যদি কোনো সাংবাকিদের গাড়ি আটক করেন তাহলে তাদের সম্মান করে তারা এসকল গাড়ি ছেড়ে দেন। প্রশাসন বলছে আইন সবার জন্য সমান। আইনের উর্ধ্বে কেউই নন। তবে কীভাবে এসকল ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে চলছে- এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি ট্রাফিক বিভাগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দৈনিক সিলেট সুরমা ও আলোকিত সিলেট টুয়েন্টিফোর ডট কম এর ‘লগো’ দিয়ে মোবারাক হোসেন পাপ্পু নামের একজন ব্যক্তি অন্তত ২০টি ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে ভাড়ায় চালাচ্ছেন।

জাতীয় দৈনিক রুদ্র বাংলা নামে ‘লগো’ দিয়ে ফয়সল আহমদ নামে একজন ব্যক্তি ৩৫টি ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে ভাড়ায় চালাচ্ছেন।

বাংলাদেশ সমাচার নামে একটি পত্রিকার কানাইঘাট প্রতিনিধি জিয়ার চলছে ৩০টি সিএনজি অটোরিকশা। গাছবাড়ি এলাকায় জয়নাল নামক এক কথিত সাংবাদিকের চলছে ৫০টি সিএনজি অটোরিকশা।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলার মাটি ডট কম-এর ‘লগো’ লাগিয়ে আখলিছ আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি নগরীতে ১২টি ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে ভাড়ায় চালাচ্ছেন।

যুগপৎ নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ‘লগো’ দিয়ে বাপ্পি চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি ১৭টি ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে ভাড়ায় চালাচ্ছেন।

অর্থমন্ত্রীর কাছের মানুষ দাবি করে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা দৈনিক সিলেট সুরমা ফটো সাংবাদিক ও আলোকিত সিলেট টুয়েন্টিফোর ডট কম-এর সম্পাদক মোবারাক হোসেন পাপ্পু জানিয়েছেন, ট্রাফিক অফিসকে অবগত করে তিনি নগরীরতে রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার ৪টি এবং সিলেটের ৪টি সিএনজি অটোরিকশার ভাড়ায় চালাচ্ছেন। নগরীতে ২০টি গাড়ি চলছে তা তার জানা নেই। তিনি এসকল গাড়ি আটকের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।

নিজের একটি ‘অনটেস্ট’ সিএনজি অটোরিকশা চলছে বলে দাবি করেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলার মাটি ডট কম-এর সম্পাদক আখলিছ আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আমি অসুস্থ তাই ট্রাফিক অফিসে গিয়ে আমার গাড়ি চালানোর অনুমতি নিয়েছি। এই গাড়িটি আমাকে নিয়ে যাতায়াত করে। ১২টি ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা বাংলার মাটি ডট কম-এর ‘লগো’ লাগিয়ে নগরীতে চলছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না।

যুগপৎ ডট কম-এর ‘লগো’ লাগিয়ে বাপ্পি চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি ১৭টি ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে ভাড়ায় চালাচ্ছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে যুগপৎ ডট কম-এর সম্পাদক সুমন দে জানান, বাপ্পি চৌধুরী অতীতে তার অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করতো। এখন নেই। যদি তার অনলাইনের নামে কোনো ব্যক্তি ‘অনটেস্ট’ বা রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা চালায় তাহলে তার বিরুদ্ধে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জাতীয় দৈনিক রুদ্র বাংলা নামে ‘লগো’ ব্যবহার করে অবৈধ গাড়ি চালানোর ব্যাপারে ফয়সল আহমদ বলেন, আমাদের ৩৫টি ‘অনটেস্ট’ বা রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা নেই। আমাদের মাত্র ৪টি ‘অনটেস্ট’ সিএনজি অটোরিকশা আছে। এই সব গাড়ি দিয়ে আমরা আমাদের পত্রিকা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিলি করি। আর বাকি সিএনজি অটোরিকশায় আমাদের পত্রিকার বিজ্ঞাপনের জন্য ‘লগো’ লাগানো রয়েছে।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি তাপস দাশ পুরকায়স্থ বলেন, নিবন্ধনহীন কোনো যানবাহন রোডে চলাচল নিষিদ্ধ। এটাই বাংলাদেশের আইন। কোনো পত্রিকার নামে ‘অনটেস্ট’ বা রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা সিলেট জেলায় চলাচল করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আমি প্রশাসনের প্রতি আহবান জানাই।

সিলেট বিআরটিএ সহকারী পরিচালক কে. এম. মাহবুব কবির জানান, ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা সিলেট জেলায় চলাচল নিষিদ্ধ। যদি কেউ ভাড়ায় নগরীতে এসব যানবাহন চালিয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, বিআরটি’র পাশাপাশি ট্রাফিক বিভাগও এই সকল রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা আটকে সহায়তা করতে হবে।

এ বিষয়ে দৈনিক সবুজ সিলেটের সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, পত্রিকার নাম ব্যবহার করে কোনো সাংবাদিক নামধারী কেউ যদি অবৈধ ফায়দা হাসিল করতে চায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সাংবাদিকতা অন্য দশটা পেশার মতো। সাংবাদিকতা ফলিয়ে অবৈধ ফায়দা হাসিল অনৈতিক। প্রশাসনের উচিত এসকল নামধারী সাংবাদিকদের আটক করে গাড়ি জব্দসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। প্রশাসন কেনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেনা তা রহস্যজনক। কতিপয় ট্রাফিক সার্জেন্টের সাথে এসকল ভূয়া সাংবাদিকদের সুসম্পর্ক ও ভাগ বাটোয়ারার সম্পর্ক থাকায় নগরীতে এসকল অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা চলছে।

দৈনিক সবুজ সিলেট ও দৈনিক সিলেটের মানচিত্রের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অপকর্ম করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি তিনি আহবান জানান।

এ ব্যাপারে উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। ‘অনটেস্ট’ এবং রোড পারমিটবিহীন অন্য জেলার সিএনজি অটোরিকশা যেখানেই দেখেন আটক করেন। যদি কেউ ভাড়ায় নগরীতে এসব যানবাহন চালিয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। আইন সবার জন্য সমান। আইনের উর্ধ্বে কেউই নন।

সুত্র-সবুজ সিলেট

সংবাদটি 2,150 বার পঠিত
advertise