|

বিএনপিতে ফিরছেন সংস্কারপন্থীরা!

‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) যত ক্ষমা করতে জানেন দলের নেতারা তত ভুল করতে জানেন না’-দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির সঙ্গে থাকা এক সিনিয়র নেতার এমন পর্যবেক্ষণ। সেই নেতার মন্তব্য আরও বাস্তবতা পেল বিএনপির সংস্কারপন্থীদের ক্ষমার মধ্য দিয়ে।

ঘরের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত বিএনপির সংস্কারপন্থীদের অতীতের সব ভুল ক্ষমা করে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দলীয়প্রধান।

এমন নির্দেশনায় দলীয় কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকা দুই ডজন সাবেক মন্ত্রী-এমপি সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেলেন।

আগামী ১৫ বা ১৬ অক্টোবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে এসব সংস্কারপন্থী নেতা ঘরে ফিরবেন বলে জানা গেছে।

লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সংস্কারপন্থীদের যারা দলে ফিরতে চান তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। এরপরে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় এবং তাদের দলে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে শিগগিরই বড় ধরনের আন্দোলন শুরু করা হবে। তার আগেই দলকে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। এরই অংশ হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও দলছুট এসব নেতাকে বিএনপিতে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব দলছুট নেতার মধ্যে অর্ধশতাধিক সংস্কারপন্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বহিষ্কৃত শতাধিক নেতাও রয়েছেন।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। যারা আসতে চান তারা আসতে পারেন।

বিএনপিদলীয় সূত্র জানায়, ‘সংস্কারপন্থী’ অভিযোগে দলের বাইরে অবস্থানকারী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেডএ খান, সাবেক সচিব-রাষ্ট্রদূত এ এইচ এম মোফাজ্জল করিম, সাবেক হুইপ ও পিরোজপুর জেলার সাবেক সভাপতি সৈয়দ শহীদুল হক জামাল, সাবেক হুইপ রেজাউল বারী ডিনা, সাবেক সংসদ সদস্য ও চাঁদপুর জেলার সাবেক সভাপতি এস এ সুলতান টিটু ও সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হায়দার খান, সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শহিদুজ্জামান, বরগুনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনি, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিঙ্কন, বগুড়ার সাবেক দুই সংসদ সদস্য ডা. জিয়াউল হক মোল্লা ও জিএম সিরাজ, সাবেক সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন, ঝালকাঠি-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো প্রমুখ। তবে তাদের মধ্যে সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেনকে দলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না। অন্য সবাইকে দলের কার্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত করা হবে।

দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময় দল থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কিছুদিন ধরেই চলমান ছিল। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দল থেকে বহিষ্কৃত এসব নেতার একটি তালিকা তৈরি করে দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়।

এ তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদলের ‘সোনালি অতীত’ হিসেবে পরিচিত সানাউল হক নীরু। আরও রয়েছেন- পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিনবারের পৌর মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ এম এ হান্নান, ঢাকা মহানগর জাসাস দক্ষিণের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর শিকদারসহ শতাধিক নেতা।

একটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই সংস্কারপন্থী, বহিষ্কৃত ও অভিমানে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া নেতাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দশম জাতীয় নির্বাচনে সরকারের নানা প্রলোভনেও এসব নেতা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। বরং খালেদা জিয়ার আশ্বাসে নির্বাচন ঠেকাও আন্দোলনে নানা উপায়ে সম্পৃক্ত থেকেছেন। তবে নানা কারণে তাদের আর দলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলের বাইরে থাকা এসব নেতা। তারা বিভিন্ন উপায়ে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গুলশান কার্যালয়ে দলের সাবেক দুই এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে কথা বলেন খালেদা জিয়া। অতীতের সব ভেদাভেদ ভুলে তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে দলের জন্য কাজ করতে বলেন তিনি। পর্যায়ক্রমে সংস্কারপন্থী অন্য নেতাদেরও ডাকা হবে-এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয় ওই সময়। পরে সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের সুনামগঞ্জ জেলা সভাপতি নজির হোসেনকে কার্যালয়ে ডেকে এনে তার সঙ্গেও কথা বলেন খালেদা জিয়া। এরপর দলের বহিষ্কৃত সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তির বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে আর কোনো কার্যক্রম না থাকলেও খালেদা জিয়া পর্যায়ক্রমে সব নেতার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখেন। এরই মধ্যে কারাবন্দি হন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ২৫ জুন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দলের মধ্যে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দলের ১৩৪ জন সাবেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্য সমর্থন করেন তাকে। তখন থেকে ওই অংশটি বিএনপিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের পর খালেদা জিয়া গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন ও দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে বহিষ্কার করেন। সে সময় দলের মহাসচিব হিসেবে নিযুক্ত হন প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।

বহিষ্কৃত নেতাদের বিষয়ে বিএনপি সূত্র জানায়, নব্বই দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের স্বার্থে তখন আলোচনার ভিত্তিতে সাময়িক সময়ের জন্য ছাত্রদলের প্রাণপুরুষ হিসেবে পরিচিত সানাউল হক নীরুকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অথচ সেই সাময়িক সময় দীর্ঘ ২৮ বছরেও শেষ হয়নি। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জনপ্রিয় নেতা আলহাজ এম এ হান্নান ২০০৯ সালে বহিষ্কৃত হন। অভিযোগ, এই আসনের সাবেক এমপি লায়ন হারুন- অর রশীদের প্রভাবে তার বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। সাংগঠনিক নেতা হিসেবে পরিচিত ঢাকা মহানগর জাসাস দক্ষিণের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর শিকদারের মতো আরও অনেক নেতাকেই বছরের পর বছর বহিষ্কৃত করে রাখা হয়েছে।

এবার দলের স্বার্থে তাদের বিএনপিতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। সংস্কার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিভক্তির রেখা মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।

সংবাদটি 112 বার পঠিত
advertise