|

সম্ভাব্য বিদ্রোহী নিয়ে চিন্তিত আ’লীগ

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই মাঠে-ময়দানে সক্রিয় হয়ে উঠছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। প্রতিটি আসনেই একাধিক প্রার্থী নিজেদের মতো করে নানামুখী প্রচারণা ও জনসংযোগে ব্যস্ত রয়েছেন। কোনো কোনো আসনে পাঁচজন, এমনকি তারও অধিক প্রার্থী রয়েছেন মাঠে।

সে জন্য আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে অধিকাংশ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে।

তবে দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা যাকে যোগ্য মনে করবেন তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। তিনিই হবেন নৌকার প্রার্থী। আর এ ক্ষেত্রে কেউ বিদ্রোহ করলে তার ‘খবর’ আছে।

দলের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে নাম চাউর হওয়ার ভয়ে এখনই কেউ সরাসরি প্রার্থী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করছেন না। তবে মাঠে-ময়দানে ঘুরে, সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে জনসংযোগ করে কৌশলে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বড় বড় বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছাপিয়ে কেউ কেউ লিখছেন ‘আমার মার্কা নৌকা’ বা ‘আমি জয় বাংলার লোক’।

কেউ কেউ দোয়া চাইছেন, বিশেষ বিশেষ দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে বহুরঙা পোস্টার ও বিলবোর্ড ছাপাচ্ছেন। কেউ কেউ দলের শীর্ষনেতা, বড় নেতা, মাঝারি নেতার ছবির সঙ্গে নিজের ছবি ছাপিয়ে প্রকাশ করছেন প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জেলা ও থানায় একেক সম্ভাব্য প্রার্থীকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে একাধিক সমর্থক গোষ্ঠী বা দল-উপদল। দলীয় কর্মসূচিতে বড় বড় জমায়েত নিয়ে হাজির হচ্ছেন অনেকে। শোডাউন দিয়ে নিজেদের শক্তি ও জনসমর্থন বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

এদিকে সময় যতই ঘনিয়ে আসছে সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে দুশ্চিন্তাও বেড়ে চলেছে। তাই যে কোনো ধরনের বিড়ম্বনা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে দল থেকে আগাম বার্তা পাঠানো হচ্ছে-দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সবাইকে কাজ করতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড থেকে।

কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড সূত্র ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, কয়েক স্তরের জরিপ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা হচ্ছে দল থেকে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতির নিজস্ব জরিপ দলের পাশাপাশি, দলীয় পর্যায়, সরকারি কয়েকটি সংস্থা এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে নানা মাত্রিক জরিপ করা হয়েছে। মনোনয়ন ঘোষণার আগ পর্যন্ত এসব জরিপ হালনাগাদ হতে থাকবে। তার ভিত্তিতেই প্রতিটি আসনে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে তাদের প্রার্থীর তালিকার খসড়া প্রস্তুত করেছে। দল, দলপ্রধান এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার জরিপ প্রতিবেদনের নিরিখে প্রার্থীদের এ খসড়া তৈরি করা হয়। দল এককভাবে নির্বাচন করলে এক ধরনের তালিকা, মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করলে আরেক ধরনের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এমনকি বিএনপি নির্বাচনে এলে এক ধরনের তালিকা এবং বিএনপি নির্বাচনে না এলে পৃথক প্রার্থী তালিকাও তৈরি করা হয়েছে দল থেকে। এর মধ্যে সব পরিস্থিতিতেই লড়তে পারবেন এমন যোগ্য ১৫১ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে সেসব প্রার্থীকে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়ে গেছে বলেও জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই প্রার্থীদের আমলনামা দেখে মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। এ জন্য সম্ভাব্য অনেক প্রার্থীকে এখনো সবুজ সংকেত দেননি। তবে তাদের থেকে কাউকে কাউকে যোগ্য বিবেচনায় এগিয়ে রাখছেন তিনি। তাদের রাখা হচ্ছে ‘গুডবুকে’। বিগত সময়ে যেসব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দল বিভিন্ন সময় বিড়ম্বনায় পড়েছে বা সমালোচিত হয়েছে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে দুঃসংবাদ।

দল থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে সে রকম কোনো প্রার্থীকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হবে না, যাদের জন্য দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সন্ত্রাস, মাদক, জামায়াত সম্পৃক্ততা আছে এমন প্রার্থীর ব্যাপারে আওয়ামী লীগ এবার অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করছে। শোডাউনে পক্ষ কিন্তু জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন নেতা এবার হালে পানি পাবেন না।

প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের খুঁত রাখতে চাইছে না দলটি। কারণ, বিএনপি এবার নির্বাচনে আসছে এটা ধরেই নির্বাচনী পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন তারা। ফলে বিএনপির মতো দলের প্রার্থী যখন মাঠে থাকবেন তার বিরুদ্ধে শক্ত, যোগ্য, অবিতর্কিত, স্বচ্ছ ইমেজধারী প্রার্থী ছাড়া নির্বাচনে জিতে আসার কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করছে আওয়ামী লীগ। তাই যে যত বাহারি প্রচারণাই করুক তাতে কোনো লাভ হবে না। আমলনামা ঠিক থাকলে, দলের জন্য ত্যাগ থাকলে এবং জনসম্পৃক্ততা থাকলে মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন প্রার্থীরা। এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের মধ্য থেকে দলপ্রধান যাকে মনোনয়ন দেবেন তাকেই ‘নৌকার প্রার্থী’ মেনে নিয়ে কাজ করতে হবে সবাইকে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘বিদ্রোহ’ বরদাশত করা হবে না এমন বার্তাই সর্বত্র পৌঁছানো হয়েছে।

গত শুক্রবার নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের কেউ দলের মনোনয়নের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তার ‘খবর আছে’। বিদ্রোহ করলে সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার। কাজেই অপকর্ম করবেন না। কারও ব্যাপারে গীবত করবেন না। আওয়ামী লীগ যদি আওয়ামী লীগের শত্রু হয়, বাইরের শত্রু প্রয়োজন হবে না।

তিনি বলেছেন, প্রার্থী হতে চাওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু প্রার্থী হতে গিয়ে ঘরের মধ্যে ঘর করবেন না। মশারির মধ্যে মশারি লাগাবেন না। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তিনি বাকি প্রার্থীদের শত্রু ভাববেন না। যারা মনোনয়ন চাইবে তাদের মনোনয়নের মার্কা হবে নৌকা।’

টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে গেলে ‘এক আসন এক প্রার্থী’র কোনো বিকল্প আছে বলে মনে করছে না আওয়ামী লীগ। কিন্তু এরই মধ্যে যেসব সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন, কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভোট চাইছেন নৌকায়, তাদের মধ্যে কি ‘বিদ্রোহী’ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে না আওয়ামী লীগ?

দলের একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ দেশের প্রাচীন ও সবচেয়ে বড় দল। রীতিমতো একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে দলে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যাও বেশি। সেখান থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা দুরূহ কাজ। কিন্তু গণতান্ত্রিক চর্চা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনে বিজয়ের স্বার্থে একজন প্রার্থীকেই বেছে নিতে হয় দলকে। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ অতি আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে ‘বিদ্রোহী’ হতেই পারেন। কিন্তু সেটা হবে দলের জন্য ক্ষতিকর।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, আওয়ামী লীগ বড় দল। সর্বত্রই একাধিক প্রার্থী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সবাই মাঠে থাকবে। কিন্তু দলীয় ফোরামে ঠিক হবে প্রার্থী কে হবেন। এ ক্ষেত্রে দল তৃণমূলের মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। আমরা এখনো প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করিনি। এখনো বাছাইয়ের কাজ চলছে।

আওয়ামী লীগ মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য রশিদুল আলম বলেন, দেশের সব আসনেই দলের একাধিক যোগ্য প্রার্থী আছে। সবাইকে তো আর মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। দলীয় সভাপতির নির্দেশ আছে কর্মিবান্ধব, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিদেরই দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা আসনভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করছি। নানা পর্যায়ের জরিপ কাজও চলছে। সব বিবেচনা করেই প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

সংবাদটি 136 বার পঠিত
advertise