|

শিশুদের ডায়রিয়াজনিত রোগ ও তার প্রতিকার

ডায়রিয়া বা উদারাময় রোগ বাংলাদেশের একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা না করলে মারাত্মক ঝুঁকি হতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের শতকরা ৩০ ভাগ শিশু ডায়রিয়া এবং তৎজনিত অপুষ্টির কারণে মারা যায়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর তৃতীয় সর্বোচ্চ কারণ ডায়রিয়া, অন্য দুটি যথাক্রমে অপুষ্টি ও নিউমোনিয়া। প্রতিবছর প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ শিশু ডায়রিয়াজনিত কারণে মারা যায়। ডায়রিয়া রোগ সম্পর্কে জানিয়েছেন আইসিএইচ ও শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ডা. এন কে ঘোষ (সুমন)। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিফুর রহমান। সাপ্তাহিক: ডায়রিয়া কী? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): সহজ কথায় বলতে গেলে, ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়াকে ডায়রিয়া বলে। ১. পায়খানা পাতলা হওয়া অর্থাৎ মলে পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চাইতে বেশি হওয়া।২. ঘন ঘন (বার বার) পায়খানা হওয়া, সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় তিন বা তারও বেশি বার পায়খানা হলে ডায়রিয়া বলা যায়। সাধারণ লোকের ভাষায় ডায়রিয়াকে ‘পেটের অসুখ’ বা ‘পাতলা পায়খানা’ বলে। সাপ্তাহিক: কোন বয়সে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি হয়ে থাকে? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ৬ মাস হতে ২ বছরের শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া রোগ বেশি দেখা যায়। তবে ৬ মাসের কম বয়সের যেসব শিশু গরুর দুধ বা গুঁড়া দুধ খায় তাদের মধ্যেও ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি। সাধারণভাবে ৫ বছরের কম বয়স্ক শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া রোগে আক্রান্তের হার বেশি হয়ে থাকে। সাপ্তাহিক:ডায়রিয়ার ধরন সম্পর্কে যদি বলেন? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ক) অসুখের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে: ১. হঠাৎ ডায়রিয়া: হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন (তবে ১৪ দিনের বেশি নয়) স্থায়ী হয়। ২. শুরু হবার পর ১৪ দিন বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে থাকে। ৩. দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া: শুরু হবার পর ২৮ দিন বা তারও বেশি সময় (কখনও কয়েক মাস) ধরে চলতে থাকে। খ) মল কতটা তরল এবং তাতে রক্ত আছে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে :১. জলীয় ডায়রিয়া: মল খুব পাতলা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে একেবারে পানির মতো। মলে কোনো রক্ত থাকবে না। ২. আমাশয়: মলে রক্ত থাকবে এবং তা চোখে দেখা যাবে। সাপ্তাহিক: কীভাবে ডায়রিয়ার জীবাণু খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ডায়রিয়ার রোগজীবাণু ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম-খাদ্য ও পানীয়, মাছি, মল, অপরিষ্কার হাত, বাসনপাত্র বা সচরাচর ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিসপত্র।সাপ্তাহিক: কী কী শারীরিক অবস্থায় ডায়রিয়া সহজেই সংক্রমিত হয়? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ১. অপুষ্টির কারণে ডায়রিয়ার জীবাণু সহজেই আক্রমণ করতে পারে। ২.কতকগুলো রোগ: যা সাধারণভাবে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যেমন- হাম, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া।সাপ্তাহিক: ডায়রিয়ার অন্য কোন লক্ষণ রয়েছে কি? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): পাতলা পায়খানার সঙ্গে পেটে মোচড় দেয়া, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব ও বার বার বমি হওয়া। অনেক সময় জ্বর ও কাঁপুনি থাকতে পারে। পায়খানার সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পানিশূন্যতা। পানিশূন্যতা অনেক বেশি হলে বিভিন্ন অরগ্যান ডেমেজ হয়ে যেতে পারে এবং যার কারণে শিশু শক ও কোমা বা জ্ঞান হারাতে পারে। সাপ্তাহিক: ডায়রিয়ার পরিণতি কী হতে পারে? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ডায়রিয়ার তাৎক্ষণিক পরিণতি হচ্ছে পানিস্বল্পতা এবং সময়মতো পানিস্বল্পতার সুচিকিৎসা না হলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। এছাড়াও ডায়রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হিসেবে অপুষ্টি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রোগ দেখা দিতে পারে। সাপ্তাহিক:ডায়রিয়ার লক্ষণ ও চিকিৎসা কীভাবে করে থাকেন? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ডায়রিয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি। মাকে তিনটি নিয়ম ভালোভাবে জানতে হবে- ১. পানিস্বল্পতা যাতে না হয় সেজন্য শিশুকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তরল খাবার দেয়া প্রয়োজন। যেমন- ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, ডাবের পানি, কিংবা শুধু পানি। ২. পুষ্টিহীনতা যাতে না হয় সেজন্য শিশুকে প্রচুর খাবার দেয়া প্রয়োজন। >> বুকের দুধ ঘন ঘন খাওয়াতে হবে। শিশু অন্য দুধে অভ্যস্ত হলে তাই খাওয়াতে হবে এবং কমপক্ষে প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর খাওয়াতে হবে। >> টাটকা খাবার- যে বয়সের জন্য যে খাবার স্বাভাবিক তাই খাওয়াতে থাকুন। ৩. নিচের লক্ষণগুলোর যে কোনো একটি দেখা দিলে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। >> খাদ্য ও পানীয় গ্রহণে অনীহা। >> জ্বর। >> মলের সঙ্গে রক্ত। >> চোখ বসে যাওয়া। >> যদি তিন দিনের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হয়। >> শিশু যদি বমি করে তবে ৫-১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এরপর আবার আস্তে আস্তে প্রতি ২-৩ মিনিট পর পর ১ চামচ করে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। খাবার স্যালাইনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ এবং অন্যান্য খাবারও খাওয়াতে হবে। ডায়রিয়ার রোগীকে ডায়রিয়া চলাকালীন স্বাভাবিক সব ধরনের খাবার এবং পরে বাড়তি পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে নইলে অপুষ্টিতে ভুগবে। সাপ্তাহিক: কখন রোগীকে হাসপাতালে বা চিকিৎসকের নিকট পাঠাতে হবে? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন):৩ দিনের মধ্যে রোগীর অবস্থার উন্নতি না হলে। এমনকি বার বার পানির মতো পাতলা পায়খানা হতে থাকে এবং সে অনুযায়ী খাবার স্যালাইন খাচ্ছে না। যদি বার বার বমি হতে থাকে এবং কিছুই খেতে না পারে। রোগীর যদি প্রচণ্ড পিপাসা পেতে থাকে। রোগী যদি খাওয়া বা পান করা কমিয়ে দেয়/ ছেড়ে দেয়। মলে রক্ত দেখা দিলে। যদি জ্বর থাকে। রোগীর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে। এটি ডায়রিয়া রোগের মারাত্মক একটি জটিলতা। যদি বিগত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর প্রস্রাব না হয়ে থাকে তবে অবিলম্বে তাকে নিকটবর্তী চিকিৎসা কেন্দ্রে (থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে) পাঠাতে হবে। সাপ্তাহিক: ডায়রিয়া চিকিৎসায় ওষুধের ব্যবহার কী করতে হয়? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): ডায়রিয়া একটি আন্ত্রিক রোগ (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) অর্থাৎ কোনো ওষুধ ব্যবহার না করলে তা এক সময় এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তাই প্রায় সকল ডায়রিয়াতেই প্রকৃতপক্ষে স্যালাইন ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না�� ডায়রিয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত জীবাণুসমূহের অধিকাংশের বিরুদ্ধে এন্টিবায়োটিকের কোনো কার্যকারিতা নেই।সাপ্তাহিক: ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয় কি? ডা. এন কে ঘোষ (সুমন): খাবার আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে, মল পরিষ্কার করার পরে, শিশুর মল পরিষ্কার করার পর রান্নার আগে, খাবার পরিবেশন করার আগে হাত ধুতে হবে। অন্য ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাÑনিয়মিত নখ কাটা (নখ ছোট রাখা), প্রতিদিন গোসল, বাচ্চাকে দুধ দেবার আগে স্তন পরিষ্কার করা। এছাড়া বাড়তি খাবার দিতে হবে। বুকের দুধ দিতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে। হামের টিকা দিতে হবে। ল্যাট্রিন বা পায়খানা ব্যবহার করতে হবে। বাচ্চার মল দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সংবাদটি 90 বার পঠিত
advertise