ঘটকের তেলেসমাতি

দৈনিক পত্রিকাগুলোর পাতায় পাতায় খবরের পাশাপাশি থাকে নানান ধরনের বিজ্ঞাপনের প্রসরা। আমাদের চোখ পাত্র-পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন গুলোর দিকে।

তখন চোখ পরল ঘটক টিয়া ভাইয়ের বিজ্ঞাপনের উপর। লিখা আছে ইংল্যান্ডের সিটিজেন সুন্দরী পাত্রীর জন্য পাত্র আবশ্যক। পাত্রকে পাত্রীর নিজ খরচে বিদেশে নিয়ে যাবেন। এই বিজ্ঞাপনের নিচে দেওয়া আছে মোবাইল নম্বর।

পাত্র সেজে কথা হল ঘটক টিয়ার সাথে। ঘটক টিয়ার সাথে দেখা করতে হলে যেতে হবে রাজধানীর কাকলি মোড়ে সেখানে গিয়েও দেখা মিলল না ঘটকের সাথে। তিনি মোবাইল ফোনে দাবি করলেন বিকাশের মাধ্যমে তিন হাজার টাকা পাঠতে কিন্তু এই প্রতিবেদক ঘটককে না দেখে তিন হাজার টাকা পাঠাতে রাজি হননি।

দেশের বেসরকারি একটি টেলিভিশনের ইনভেস্টিগেশন ৩৬০ ডিগ্রি টিমের কাছে এলো নতুন এক খবর। পত্রিকার পাতার বিজ্ঞাপন দেখে এক ঘটকের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন খিলগাঁওয়ের আশরাফ আলী (ছদ্মনাম)। তার সাথে সব কথা হয়েছিল পাকাপাকি চূড়ান্ত হয়েছিল বিয়ের তারিখও। ঘটকের কথা অনুযায়ী দুদিন পর ১ লাখ টাকা নিয়ে করিম ঘটকের অফিসে যান আশরাফ আলী। কিন্তু এর পরের অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ। আশরাফের দাবি ঘটকালির আড়ালে প্রতারণা করাই করিম ঘটকের প্রধান কাজ। আর আশরাফের মত অসংখ্য মানুষ লোভে পড়েন পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে। কিন্তু প্রশ্ন হল এসব প্রতারণার ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো তার দায় এড়াতে পারে?

দায় আসলে সবারই আছে কিন্তু প্রশ্ন হলো আশরাফ আলীর বক্তব্য সত্য বলে ধরে নেওয়া কি উচিত হবে? কারণ যিনি পরিবার পরিজনকে কিছু না জানিয়ে প্রবাসী পাত্রী বিদেশে পাড়ি জমানো লোভে পড়েন তিনি তো উল্টাপাল্টা তথ্য দিতে পারেন। আশরাফ আলীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। তাই সে কারণে এবার পাত্র সেজে ঘটক করিম ভাইয়ের অফিসে টিম ৩৬০ ডিগ্রি।

পত্রিকার পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ে করিম ঘটকের বিজ্ঞাপন। তার কাছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকান প্রবাসী বিভিন্ন বিবাহ যোগ্য পাত্রীর সন্ধান আছে।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রধান গেট সংলগ্নের সামনেই করিম ঘটকের অফিস। পাত্র সেজে এক প্রতিবেদক তার অফিসে ঢুকে পরেন। ভিতরে যাওয়ার সাথে সাথেই দেখা হয় মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ওরফে করিম ঘটকের সাথে। তিনি জানান, এখানে সদস্য হতে ফি হিসাবে অফারের যোগ্য ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে অনুরোধ করায় ৫ হাজার টাকা রাখার জন্য রাজি হয়ে যান তিনি।

একদিন পর করিম ঘটকের কথা অনুযায়ী তার অফিসে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে হাজির হয় ওই প্রতিবেদক। টাকা নিয়ে করিম ঘটক একটা ফর্ম পূরণ করতে বলেন। এক কপি ছবি ও পূরণ করা ফর্ম তার হাতে দেওয়ার পর কথা অনেকটাই বদলে ফেলেন তিনি। অথচ তিনি প্রথম দিন বলেছিলেন আগে পাত্রী দেখাবেন পরে তাকে দিতে হবে
৫০ হাজার টাকা। পরে অনেক চেষ্টার পর করিম ঘটককে রাজি করানো হয় পাত্রী দেখানোর পর ৫০ হাজার ও বিয়ের পর আরও তাকে দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট ১ লাখ টাকা।

শুভ কাজে দেরি করতে নেই, কিন্তু যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে কারণ ৬ দিন পেরিয়ে গেছে করিম ঘটকের কোন ফোনের দেখা নেই। অবশেষে সপ্তম দিনে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন। অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী পাত্রী পাওয়া গেছে। এখন বিয়ের পুরো প্রস্তুতি নিয়ে পাত্রীর সাথে দেখা করতে যেতে হবে করিম ঘটকের অফিসে। যদি আশরাফ আলীর বক্তব্য সঠিক হয়ে থাকে তাহলে নিজেদের নিরাপত্তাটাও জরুরি। তাই বর পক্ষ হিসাবে দাওয়াত দেয়া হয় ঢাকা মহানগর উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দলকে। সেই দলের নেতৃত্বে আছেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিশাত রহমান মিথুন।

পাত্রী দেখতে টাকা লাগবে ৫০ হাজার তাই সাবধানতার জন্য সাথে নেওয়া হল নকল পঞ্চাশ হাজার টাকা। ঘটকের অফিসের সামনেই অবস্থান নিল টিম ৩৬০ ডিগ্রি ও ডিবি পুলিশের কর্মকর্তারা।

এবার পাত্র ঘটকের কাছে যাওয়ার পালা। করিম ঘটক পাত্রের অপেক্ষায় ছিলেন। এবার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পাত্রী দেখার পালা। পাশের রুমে যেতেই চোখে পরল দুজন নারী ও একজন পুরুষকে৷

পাত্রীর পরিবার পাত্রকে পছন্দ করেছেন তবে শর্ত একটাই বিয়ে করে ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। পাত্রও রাজি। একদিকে কথাবার্তা চলছে অপরদিকে টিম ৩৬০ ডিগ্রি ও ডিবি পুলিশের অপেক্ষার প্রহর বাড়ছে। তাই নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাবার পর আর কেউ অপেক্ষা করতে চাইল না।

শুরু হল ঢাকা মহানগর উত্তর গোয়েন্দা বিভাগের অপারেশন। বেরশিকের মত হানা দিল গোয়েন্দা পুলিশ। এখন মেয়ের আপন চাচা নিজ ভাতিজিকে চিনতে চাইছেন না। অথচ একটু আগেই তিনি মুরুব্বির ভূমিকা নিয়ে পাত্র পছন্দ করেছেন।

অবশেষে করিম ঘটকের ঠিক করা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পাত্রী নিজেই সব ফাঁস করেন। তিনি বলেন, আমি একটা পার্লারে কাজ করতাম। আমার বাড়ির সাথেই ঘটকের বাড়ি। তার (ঘটকের) স্ত্রী আমাকে এখানে নিয়ে আসলে প্রতিবারই ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দেয়।

তার মানে বিউটি পার্লার কর্মী তুলনা রানী দাসকে প্রবাসী সুমি আক্তার সাজিয়ে একেক সময় একেক পাত্রর সামনে হাজির করা হত। বিনিময়ে তাকে দেওয়া হত ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা।

একবার নয় দুই দফায় প্রতারণার শিকার। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল আপত্তিকর অবস্থায় ছবি তুলে ব্লাকমেইল। যারা এসব ভুয়া ঘটকের কাছে গিয়ে বিদেশি পাত্র-পাত্রী করতে চেয়ে এমন ফাঁদে পরে যান তারা লোকলজ্জার চোখে কিছু বলতে পারেন না। অথচ চুপচাপ দিনের পর দিন টাকা গুনে জান এসব প্রতারক এর কাছে। প্রবাসী পাত্র পাত্রী বিয়ে করে বিদেশে যাবার স্বপ্ন তখন দূর স্বপ্ন হয়ে যায়।

এই প্রতিবেদনটি বেসরকারি একটি টেলিভিশনের ‘ইনভেস্টিগেশন ৩৬০ ডিগ্রি’ অনুষ্ঠান অবলম্বনে করা হয়েছে।