রোযাদারের করণীয় ও বর্জনীয় 

মাওলানা মুতাসিম বিল্লাহ :: হযরত আবী উবায়দা রাঃ হুজুর (সঃ) এর বানী বর্ননা করেন রাসুল (সঃ) বলেনঃ রোযা মানুষের জন্য ঢাল স্বরূপ,যতক্ষন উহাকে ফাড়িয়া না ফেলে।
ব্যাখা- ঢাল হইবার অর্থ হইল, মানুষ যেভাবে ঢাল দ্বারা নিজের হেফাজত করে। ঠিক তেমনিভাবে রোযার দ্বারাও নিজের আসল দুশমন অর্থাৎ শয়তান হইতে আত্ম রক্ষা হয়।
অন্য রেওয়ায়াতে আসিয়াছে, রোযা আল্লাহর আজাব হইতে রক্ষা করে। অপর এক বর্ননা মতে রোযা জাহান্নাম হইতে বাঁচাইয়া রাখে।
এক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে যে, কেহ আরজ করিল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. রোযা কোন জিনিসের দ্বারা ফাড়িয়া যায়?
তিনি(সাঃ) উত্তরে বিললেন, মিথ্যা এবং গীবত দ্বারা। উপরোক্ত দুইটি রেওয়ায়ত এবং আরও বিভিন্ন রেওয়ায়তে রোযা রাখা অবস্তায় এই ধরনের কাজ হইতে বাঁচিয়া থাকার তাকিদ আসিয়াছে।
এবং এই কাজ গুলোকে যেন রোযা বিনষ্টকারী হিসাবে সাব্যস্ত করা হইয়াছে।
আমাদের এই যুগে রোযা রাখিয়া আজে-বাজে কথাবার্তায় মশগুল হওয়াকে সময় কাটানোর উপায় মনে করা হয়।
কোন কোন আলেমদের মতে মিথ্যা ও গীবত দ্বারা রোযা নষ্ট হইয়া যায়।
এই দুইটি বিষয় এই সকল আলেমদের নিকট খানা পিনা ইত্যাদি অন্যান্য রোযা ভঙ্গকারী জিনিসের মতই।
আর অধিকাংশ আলেমদের মতে যদিও রোযা ভঙ্গ হয় না, কিন্তু রোযার বরকত নষ্ট হইয়া যাওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত।
মাশায়েখগন রোযার ছয়টি আদব লিখিয়াছেন। রোযাদার ব্যক্তির জন্য এই বিষয় গুলির প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরী।
১নং দৃষ্টির হেফাযত করা। যেন কোন অপাত্রে দৃষ্টিপাত না হয়। এমনকি স্ত্রীর প্রতিও যেন কামভাবের দৃষ্টি না পড়ে। সুতরাং বেগানা মহিলার তো প্রশ্নই উটে না।এমনি ভাবে কোন খেলা ধুলা ইত্যাদি নাজায়েজ কাজের দিকেও যেন দৃষ্টি না যায়। নবীয়ে করিম ইরশাদ ফরমাইয়েছেন, দৃষ্টি  ইবলিশের তীর সমূহের একটি তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার ভয়ে ইহা হইতে বাঁচিয়া চলিবে, আল্লাহ তা’য়ালা তাহাকে এমন ঈমানী নূর দান করিবেন যাহার মিষ্টতা ও স্বাদ সে তাহার দিলের মধ্যে অনূভব করিবে।
২ নং জবানের হেফাযত করা। মিথ্যা, চুগলখোরি, বেহুদা কথাবার্তা, গীবত, অশ্লীল কথাবার্তা, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি সব কিছুই ইহার অন্তর্ভুক্ত।
৩ নং যাহার প্রতি রোযাদারের গুরুত্ব দেওয়া জরুরী, উহা হইল কানের হেফাজত। প্রত্যেক অপ্রিয় বিষয় যাহা মুখে বলা বা জবান হইতে বাহির করা নাজায়েয উহার প্রতি কর্ণপাত করাও নাজায়েয। নবী করীম (সাঃ)এরশাদ করেন, গীবতকারী এবং গীবত শ্রবনকারী উভয়ই গুনাহের মধ্যে অংশীদার হয়।
৪নং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-পতঙ্গকে হেফাযত করা। যেমন হাতকে নাজায়েয বস্তু ধরা হইতে,পা কে নাজায়েয বস্তুর দিকে যাওয়া হইতে বিরত রাখা। অনুরুপভাবে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-পতঙ্গকে বিরত রাখা।
এমনিভাবে ইফতারের সময় পেটকে সন্দেহযুক্ত খাবার থেকে হেফাযত করা। যে ব্যক্তি রোযা রাখিয়া হারাম মাল দ্বারা ইফতার করে, তাহার অব্স্তা ঐ ব্যক্তির মত, যে কোন রোগের জন্য ঔষধ সেবন করে, কিন্তু উহার সাথে সামান্য বিষও মিশাইয়া লয়, ফলে তাহার সেই রোগের জন্য ঔষধটি উপকারী হইবে টিক, কিন্তু সাথে সাথে এই বিষ তাহাকে ধ্বংসও করিয়া দিবে।
৫নং ইফতারের সময় হালাল মাল হইতেও এত বেশী না খাওয়া, যাহার দ্বারা পেট পুরাপুরি ভরিয়া যায়। কেননা ইহাতে রোযার  উদ্দেশ্য নষ্ট হইয়া যায়। রোযার দ্বারা উদ্দেশ্য হইল, কামপ্রবৃত্তি ও পশু শক্তিকে দুর্বল করা এবং নূরানী ও ফেরেশ্তাসুলভ শক্তিকে বৃদ্ধি করা।
৬নং যে বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখা একজন রোযাদারের জন্য জরুরী তাহা এই যে, রোযা রাখার পর এই ভয়ে ভীত হওয়া যে, নাজানি এই রোযা কবূল হইতেছে কিনা। অনুরুপভাবে প্রত্যেক এবাদত শেষ করার পর এই ধারনা পোষন করা চাই।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, কুতিবা আলাইকুমুস সিয়ামু। অর্থাৎ “তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হইয়াছে ” আল্লাহ তা’য়ালার এই হুকুম দ্বারা মানুষের প্রতিটি  অঙ্গ-পতঙ্গের উপরই রোযা ফরয করা হইয়াছে।  সুতরাং জিহবার রোযা হইল মিথ্যা হইতে বাঁচিয়া থাকা। কানের রোযা হইল যাবতীয় নাজায়েয কথা শ্রবন করা হইতে বাঁচিয়া থাকা।  চোখের রোযা হইল সকল প্রকার নাজায়েয ও অহেতুক জিনিসের প্রতি নজর করা হইতে বাঁচিয়া থাকা। অনুরুপভাবে অন্যান্য অঙ্গ-পতঙ্গের জন্যও রোযা আছে। যেমন নফসের রোযা হইল, লোভ -লালসা ও জৈবিক চাহিদা হইতে বাঁচিয়া থাকা। দিলের রোযা হইল দুনিয়ার  মহব্বত হইতে দিলকে খালি রাখা। আত্মার রোযা হইল আখেরাতের স্বাদ ও সুখ -শান্তির কামনা হইতেও বাঁচিয়া থাকা।
আর সর্বোচ্চ শ্রেণীর খাছ রোযা হইল গায়রুল্লার অস্তিত্বের কল্পনা হইতেও বাঁচিয়া থাকা।
”অবশেষে খোদার কাছে ফরিয়াদ জানাই, তিনি যেন, আমাদের সবাইকে রোযার হক আদায় করে, রোযা রাখার তাওফিক দান করেন”। আ-মীন।
লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহ
(শিক্ষক ও জমিয়ত কর্মী)

You May Also Like