জগন্নাথপুরে অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীকে নিয়ে ‘তোলপাড়’

ওয়েছ খছরু: মেয়েটির বয়স ১৫ কিংবা ১৬। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। গৃহশিক্ষক বাপ্পার নজর পড়েছিল তার ওপর। গত মার্চ মাসে বাপ্পা স্কুল থেকে ফেরার পথে জোরপূর্বক মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। ছাতকের চানপুর গ্রামে আরেক শিক্ষক আব্দুস সামাদ আজাদের বাড়িতে নিয়ে তাকে পালাক্রমে দুই শিক্ষক ধর্ষণ করে। ঘটনার পর দরিদ্র পিতাকে সামাজিক বিচারের কথা বলে কালক্ষেপণ করে ধর্ষক ও তাদের সহযোগীরা। এরই মধ্যে মেয়েটি প্রায় ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। জগন্নাথপুর থানা পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেয়।

এরপর বাপ্পাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সব দোষ স্বীকার করে বাপ্পা আদালতে স্বীকারোক্তিও দেয়। কিন্তু ওখানেই শেষ নয় ঘটনা। বাপ্পার চাচা দিপাল দেব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় তার হুমকির কারণে ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েছে ধর্ষিতার পরিবার। টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি শেষ করার চাপ দেয়া হচ্ছে।

আলোচিত এ ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলায়। মামলা দায়ের ও আসামি গ্রেপ্তারের পর থেকে এলাকায় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে। জগন্নাথপুরের খাসিলা পূর্বপাড়া গ্রামের ওই কিশোরী স্থানীয় আটপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। পাশাপাশি বাড়ি বাপ্পা ও কিশোরীর। মিশন সেন বাপ্পা ওই কিশোরীকে বাড়িতে প্রাইভেট পড়াতো। আর শিক্ষকতা করতো সৈয়দ আইডিয়াল গার্লস হাইস্কুলে। প্রাইভেট পড়ানোর সুবাধে বাপ্পা প্রায় সময় মেয়েটিকে কু-প্রস্তাব দিতো। এমনকি প্রেমেরও আবেদন জানায়। কিন্তু ওই কিশোরী কখনোই বাপ্পার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। গত ৪ঠা মার্চ ওই কিশোরী জেএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে স্কুলে যায়। স্কুল থেকে ফেরার পথে কলকলি বাজারের কাছে ব্রিজের ওপর ওঠামাত্র বাপ্পা কাউছার ড্রাইভারের সিএনজি অটোরিকশাতে জোরপূর্বক তুলে নেয়।

এরপর সিএনজি অটোরিকশা যোগে নিয়ে যায় ছাতকের চানপুরে তার বন্ধু আব্দুস সামাদ আজাদের বসতঘরের দোতলায়। সেখানে প্রথমে বাপ্পা এবং পরে আজাদ ওই কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। প্রায় তিন ঘণ্টা তারা ওই ঘরে বন্দি রেখে ধর্ষণের পর মোবাইল ফোনে সেটির ভিডিও ধারণ করে। এরপর আবার সিএনজি অটোরিকশাযোগে বাপ্পা তাকে জগন্নাথপুরে নিয়ে আসে। পরে নিজের বাসায় গিয়ে ওই কিশোরী ধর্ষণের কথা তার পরিবারের কাছে জানায়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ঘটনার পর ধর্ষিতার পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে গেলে খাসিলা গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিপাল দেব, গ্রামের বাসিন্দা পিন্টু সেন, অর্জুন দাস মেম্বার, নিখিল পাল, কাহার মিয়া, কৃপেন্দ্রসহ কয়েক জন বিষয়টি সালিসের মাধ্যমে দেখে দেয়ার কথা বলেন। এ সময় তারা ধর্ষিতার পিতার হাতে ১০ হাজার টাকা তুলে দিয়ে কাউকে বিষয়টি না জানানোর জন্য বলেন। এরপর থেকে তারা বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা করে। এদিকে, গত ৭ই মে ওই কিশোরী হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় তাকে জগন্নাথপুর থানা হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার পরীক্ষা করে জানান, ওই কিশোরী ১০ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। এ কথা শোনার পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন দিপাল দেবসহ অন্যরা।

তারা বাপ্পার চাচার ঘরে ধর্ষিতার পিতাকে ডেকে নিয়ে গর্ভপাত ঘটানোর জন্য ১১ হাজার টাকা দেন। এতে রাজি না হলে তারা হুমকিও দেন ধর্ষিতার পিতাকে। এদিকে, এ ঘটনার পর অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর সন্তানের পিতার পরিচয়ের বিষয়টি সামনে আসে। পরে এ ঘটনায় গত ২৪শে মে জগন্নাথপুর থানায় কিশোরীর পিতা বাদী হয়ে ধর্ষণ মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় খাসিলা পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিশন সেন বাপ্পা, ছাতকের চানপুরের আব্দুল সামাদ আজাদ ও গাড়ি ড্রাইভার কাউছারকে। পুলিশ ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি বাপ্পা ও গাড়ি চালক কাউছারকে গ্রেপ্তার করেছে। জগন্নাথপুর থানার ওসি (তদন্ত) নব গোপাল গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, প্রধান আসামি বাপ্পা ঘটনা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সিএনজি অটোরিকশাযোগে মেয়েটিকে নিয়ে সে ও আজাদ মিলে ধর্ষণ করে বলে জানায়। এখন দুই আসামি কারাগারে। আব্দুস সামাদ আজাদ নামের আরেক স্কুলশিক্ষক পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এদিকে ধর্ষিতার পিতা জানিয়েছেন, তার মেয়ে এখন সাড়ে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

এখন সন্তানের পিতার দায়িত্ব কে নেবে সেটি নিয়ে তারা চিন্তাগ্রস্ত। বিষয়টি আদালতকে জানাবেন। তিনি জানান, এই অবস্থায় দিপাল দেবসহ অন্যরা তার পিছু ছাড়ছে না। তাকে ও তার মেয়েকে ক্রমাগত হুমকির মুখে রেখেছে। এ কারণে তারা তটস্থ রয়েছেন। তবে কলকলি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিপাল দেব জানিয়েছেন- তিনি এ ঘটনা কিংবা মামলার ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দেয়া হচ্ছে তা সত্য নয়। স্থানীয় জগন্নাথপুর আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, বিষয়টি এলাকার সাংসদ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নানকে জানানো হয়েছে। ধর্ষিতা পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। সূত্র: দৈনিক মানবজমিন।