রেনু হত্যাকারী কে এই হৃদয়?

গোটা দেশ দেখল নির্মম সে কীর্তি! কীর্তিই বলছি, নির্মম কীর্তি। কারণ এ ধরণের নির্মম ঘটনা আগে কখনো দেখেনি দেশবাসী। কে বা কারা কবে গুজব ছড়িয়েছিল পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে আর তাতেই ছড়িয়ে পড়েছে ছেলেধরা আতঙ্ক। আর এতে করে গত এক সপ্তাহেই মারা গেছেন প্রায় দশজন। যাদের মধ্যে কয়েকজন মানসিক প্রতিবন্ধীও ছিলেন। যারা এ ধরণের পিটুনী দিয়ে মানুষ মারছেন তারা সত্যি মিথ্যা কিছু বাঁচছেন না।

আর সর্বশেষ এ ধরণের ঘটনা রোধে পুলিশকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এবং ব্লগগুলো নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ছেলেধরা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিলে বা শেয়ার করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শনিবার (২০ জুলাই) রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাসলিমা বেগম রেনুর (৪০) মৃত্যু গোটা জাতির মনে দাগ কেটেছে। স্বামী আরেক নারীকে বিয়ে করার পর একলা চলা এই মা তার ছোট্ট ছেলে-মেয়েকে ভর্তি করার জন্য স্কুলের খোঁজ-খবর নিতে এসেছিলেন। ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে সেই স্কুলেই আটকে রেখে প্রকাশ্যে তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

রেনুকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ভিডিও এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছে, সেখানে তিন/চার তরুণকে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। তাদের ঘিরে ছিল শত শত উৎসুক জনতা, যাদের অধিকাংশই মোবাইল ফোনে ওই দৃশ্য ধারণ করছিলেন।

ভিডিও ফুটেজে যাদের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে একজন ছিল নীল টি-শার্ট পরিহিত। ওই তরুণই রেনুকে পিটিয়ে হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল। রেনু যখন বেধড়ক পিটুনি খেয়ে নিস্তেজ হয়ে স্কুল কম্পাউন্ডে পড়ে ছিল, তখনও থামেনি ওই তরুণ।

হাতে থাকা লাঠি দিয়ে রেনুর মুখে, বুকে, পেটে, হাতে ও পায়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে পিটিয়ে যাচ্ছিল। আশপাশের লোকজনের অনেকে ‘থামো থামো, আর মের না, মরে গেছে’ এসব বলে ওই তরুণকে থামানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু, পাশবিক রূপ ধারণ করে সে তখনও রেনুকে প্রহার করে যাচ্ছিল।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেনু হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া নীল-শার্ট পরিহিত ওই তরুণের নাম হৃদয়। স্কুলের পাশেই তার একটি সবজির দোকান ছিল। তবে পড়াশোনা না জানা হৃদয় উত্তর বাড্ডায় বখাটে হিসেবেই পরিচিত। মাদক সেবন ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে মারামারি-কাটাকাটি করাই ছিল হৃদয়ের কাজ।

স্কুলের উল্টো দিকেই একটি মাদ্রাসা। মাদ্রাসার পাশেই বেশ কয়েকটি পানের দোকান। তাদের মধ্যেই একজন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হয় এই প্রতিবেদকের। যারা মেরেছে তাদের চেনেন কি না এমন প্রশ্নে ওই ব্যবসায়ী বলেন, আমি তো ভেতরে ঢুকি নাই। কিন্তু, টেলিভিশনে যে ভিডিও দেখাইছে তাতে দেখলাম তিন/চারজন পিটাইয়া মারতাছে। এর মধ্যে দু’জনরে চিনি, তারা এই বাজারেরই। ওই দু’জনের একজন হৃদয়, সে স্কুলের সামনে শাক বিক্রি করত। আরেকজন মহিউদ্দিন, সে একটু সামনে সবজির দোকান নিয়া বসত। ঘটনার পর থেইকা আর ওগো দেখি নাই।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিটি নামে একটি মানবাধিকার সংস্থার কর্মী মেহেদী হাসান বলেন, হৃদয় এলাকায় বখাটে হিসেবেই পরিচিত। মাদক সেবন, ইভটিজিং, মারামারি-হানাহানি করে বেড়াত সে। মাসখানেক আগে উত্তর বাড্ডা এলাকায় কথা কাটাকাটির জের ধরে একজনকে ছুরিকাঘাতও করেছিল সে।

হৃদয়কে গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, গণপিটুনিতে তাছলিমা বেগম রেনু হত্যার ঘটনায় সোমবার সকালে বাচ্চু নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে রোববার রাতে বাপ্পী, শাহীন ও জাফর নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। দুপুরে তাদের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গণপিটুনির নেতৃত্ব দিয়েছে হৃদয় নামে একটি ছেলে। সেই ছেলেটিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজারে হৃদয়ের বাবা হানিফ আলীর সবজির দোকান রয়েছে। হৃদয় তেমন পড়াশোনা করেনি, বখে যাওয়ার পর বাবার দোকানেই মাঝে মধ্যে কাজ করত।